রহমান মৃধা
বিশ্ব এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা একসঙ্গে মিলে একটি অস্থির ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শক্তিশালী দেশগুলো তাদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে ব্যস্ত, আর দুর্বল দেশগুলো টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যবস্থায় শক্তিধর দেশগুলোর ভূমিকা:
বিশ্বে এখন শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্রতর হয়েছে।
• যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাণিজ্যযুদ্ধ ও প্রযুক্তিগত আধিপত্যের লড়াইয়ে ব্যস্ত, যার প্রভাব সরাসরি উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর পড়ছে।
• রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের কারণ হয়েছে, যার প্রভাব দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে।
• ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে নতুন মৈত্রী গড়ে তুলছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ ছোট ও দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর কী হবে?
বাংলাদেশের মতো দরিদ্র ও ছোট দেশগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
বাংলাদেশ একদিকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক সংকটের কারণে অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে।
• বৈদেশিক ঋণ ও রিজার্ভ সংকট: বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এর শর্ত কঠোর হচ্ছে, ফলে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।
• রপ্তানি খাতের চ্যালেঞ্জ: পোশাক শিল্পে চীন, ভিয়েতনাম, ও ইথিওপিয়ার প্রতিযোগিতা বাড়ছে, যা বাংলাদেশের জন্য হুমকি।
• প্রবাসী আয় কমার আশঙ্কা: মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে মন্দা দেখা দিলে রেমিট্যান্স কমতে পারে।
• রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা: দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ কি এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে বা এর জন্য কী করণীয়?
জলবায়ু পরিবর্তন ও করণীয়:
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
• উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদন হ্রাস করছে।
• নদীভাঙন ও জলবায়ু উদ্বাস্তু সমস্যা বাড়ছে, যা শহরগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
• বন্যা ও খরার প্রকোপ আরও বাড়বে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
সমাধান:
• নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর ও বায়ু শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
• লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের চাষ জনপ্রিয় করতে হবে।
• বন্যা প্রতিরোধে নেদারল্যান্ডসের মতো পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
• আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।বাংলাদেশের রাজনীতি: জনগণের সেবাই কি রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্দেশ্য, নাকি আরও স্বৈরাচারী হয়ে উঠছেবাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে, এমন ধারণা অনেকেরই। একদলীয় শাসনব্যবস্থা, বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হওয়া, এবং বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন—এসব সূচিত করে যে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য জনগণের সেবা নয়, বরং ক্ষমতা ধরে রাখা।নির্বাচনী ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক এবং দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার সাধারণ জনগণকে হতাশ করে তুলেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ছিল জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, অথচ প্রায়শই দেখা যায়, তারা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিপক্ষকে দমন করতেই ব্যস্তগণতন্ত্র যদি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে জনগণের মৌলিক অধিকার আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে। রাজনীতি যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবার উদ্দেশ্যে হত, তাহলে— স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হতো জনগণের স্বার্থে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি প্রণয়ন করা হতো কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে গিয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। বিরোধী মত দমন, ভোট কারচুপি, গুম-খুনের রাজনীতি এবং দুর্নীতি এখন সাধারণ চিত্র হয়ে উঠেছে।এখন প্রশ্ন হলো, জনগণের ভূমিকা কী?এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জনগণকেই সচেতন হতে হবে, কারণ গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক নেতাদের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। নাগরিকদের উচিত—- সচেতনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা- দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে যোগ্য নেতৃত্বকে বেছে নেওয়া দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো
যদি জনগণ নিজের অধিকার আদায়ের জন্য সক্রিয় না হয়, তাহলে রাজনীতি আরও স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠবে। এখন সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার—বাংলাদেশ কি সত্যিকারের গণতন্ত্রের পথে এগোবে, নাকি ক্ষমতার দখলদারিত্বের রাজনীতির বলি হবে?
জনগণের করণীয় ও বর্জনীয়:
পরিবর্তন আনতে জনগণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।সচেতন হতে হবে: কেবল রাজনৈতিক প্রচারণায় বিশ্বাস না করে বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।সঠিক নেতৃত্ব বাছাই করতে হবে: এমন নেতাদের সমর্থন করতে হবে যারা সত্যিই দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করেন।জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে: দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।উন্নয়ন ও মানবিক কাজকে সমর্থন করতে হবে: সামাজিক উদ্যোগগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে।রাজনৈতিক অন্ধবিশ্বাস পরিহার করতে হবে: অন্ধ সমর্থন না করে, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে মতামত দিতে হবে।
গুজবে কান দেওয়া যাবে না: সঠিক তথ্য যাচাই না করে কোনো কিছু বিশ্বাস করা যাবে না।নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা থেকে দূরে থাকতে হবে: দেশের স্বার্থে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করতে হবে।সংক্ষেপে: সমাধান কী?অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য আনতে হবে: শুধু পোশাক খাতে নয়, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে: তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে বৈশ্বিক চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে হবে।গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে: রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন, যেখানে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।আমার ব্যক্তিগত মতামত:বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং বাংলাদেশকেও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা ছাড়া বাংলাদেশের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এখনই সঠিক পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি।কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় নেই, বরং ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় আছি। আমাদের মানবিকতা ও দেশপ্রেমের জায়গায় লোভ ও স্বার্থপরতা জায়গা করে নিয়েছে।আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন বাংলাদেশে নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে, ক্ষমতা নয়।একদিন মানবিকতা ও দেশপ্রেম হবে সবচেয়ে বড় শক্তি।একদিন দেশের প্রতিটি মানুষ উন্নয়নের অংশীদার হবে, কেবল দর্শক নয়।আমরা কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?
আপনি কি প্রস্তুত?
লেখক: গবেষক ও লেখক (সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন)



