সোমবার, মার্চ ৩০, ২০২৬

ফেনীতে মাটিকাটার মহোৎসব ও বিপন্ন কৃষি: প্রশাসনের অসহায়ত্ব না কি উদাসীনতা?

আপডেট:

ফেনীর বুক চিরে কৃষি জমির ‘টপ সয়েল’ বা উপরিভাগের উর্বর মাটি যেভাবে ইটভাটায় চলে যাচ্ছে, তাকে কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় বললে ভুল হবে; এটি একটি পরিকল্পিত আত্মঘাতী প্রক্রিয়া। মাটির উপরিভাগের ১০-১২ ইঞ্চিতেই থাকে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ ও জৈব উপাদান। সেই মাটি যখন ইটভাটায় পুড়ছে, তখন প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ খাদ্য ও জীবনকেই পুড়িয়ে দিচ্ছি। ফেনীর তিনটি উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের অভিযান চললেও এই আগ্রাসন থামছে না—যা গভীর উদ্বেগের বিষয়।
​আইনি সীমাবদ্ধতা ও অভিযানের কার্যকারিতা
​বর্তমানে প্রচলিত আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জেল বা জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বিশাল অংকের মুনাফার কাছে এই নামমাত্র জরিমানা মাটিখেকোদের কাছে নস্যি। আপনি যেমনটি উল্লেখ করেছেন, অভিযানে সাময়িক স্বস্তি এলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। মাটিকাটায় ব্যবহৃত ট্রাক বা ট্রাক্টরগুলো যদি সরাসরি জব্দ করে নিলাম করা হতো, তবে হয়তো চক্রগুলো পিছু হটত। আইনের এই জায়গায় কঠোর সংস্কার এবং প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।
​প্রশাসনের ভূমিকা ও নৈতিক স্খলন
​জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—যেখানে খোদ সংসদ সদস্যরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, সেখানে কেন অবাধে মাটি কাটা চলছে? স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ এবং দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, তা যদি সত্য হয় তবে তা ভয়াবহ। প্রশাসনের ‘আইওয়াশ’ অভিযান কেবল তখনই সফল হবে যখন প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা আইনের আওতায় আসবে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা না গেলে ফসলি জমি রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
​সামাজিক বিপর্যয় ও সংঘাত
​মাটিকাটা কেবল কৃষি ধ্বংস করছে না, এটি গ্রামীণ অবকাঠামো ও জননিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ।রাস্তাঘাট ধ্বংস: ভারী ট্রাক ও ট্রাক্টর চলাচলের কারণে গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তাগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
​রক্তক্ষয়ী সংঘাত: ছাগলনাইয়ার পাঠাননগর ইউনিয়নে মাটিকাটা কেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রমাণ করে, এই অবৈধ কারবার এখন অপরাধ জগতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।জনগনের করণীয় কী?যখন রাজনৈতিক নেতা বা প্রশাসনের হুঁশিয়ারি কাজে আসে না, তখন জনগনের সম্মিলিত প্রতিরোধই একমাত্র ভরসা।
১. সামাজিক প্রতিরোধ: এলাকায় মাটি কাটা শুরু হলে ব্যক্তিগতভাবে বাধা না দিয়ে এলাকাবাসীকে সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ করতে হবে।
২. তথ্যচিত্র ও প্রচার: অবৈধ মাটিকাটার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং চাপ সৃষ্টি করা।
৩. আইনি আশ্রয়: ব্যক্তিগতভাবে বা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে রিট করার কথা ভাবা যেতে পারে।ফেনীর ফসলি জমি রক্ষা করা কোনো বিশেষ মহলের নয়, বরং এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। জরিমানা আর লোকদেখানো অভিযানের বলয় থেকে বেরিয়ে এসে প্রশাসনকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাটি বিক্রি করে সাময়িক লাভ হলেও, অনুর্বর এই ভূমি আগামী প্রজন্মকে কেবল হাহাকারই উপহার দেবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত