রবিবার, মার্চ ২২, ২০২৬

দুই তরুণ বিজ্ঞানী তৎকালীন উচ্চাভিলাষী অন্যতম এক গবেষণায় ফল আজকের ইন্টারনেট

আপডেট:

১৯৬৯। ২৯ অক্টোবর। সাড়ে তিন শ মাইল দূরে অবস্থিত দুই বিজ্ঞানী তাদের কম্পিউটারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হলেন। একটা বার্তা টাইপ করছিলেন। টাইপের কাজ যখন মাঝ পর্যায়ে, তখনই ঘটল বিপর্যয়। কম্পিউটার অচল হয়ে গেল। ক্রাশ করল। এ ঘটনার ৫৫ বছর পরে, চলতি বছরে, সেই আলাপ বিবিসির স্কট নোভেরের সাথে।

শীতল যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। চার্লি ক্লিন এবং বিল ডুভাল প্রতিভার উজ্জ্বল প্রভায় দীপ্যমান দুই তরুণ বিজ্ঞানী তৎকালীন উচ্চাভিলাষী অন্যতম এক গবেষণায় নিমগ্ন হয়ে উঠেছিলেন। ২১ বছর বয়সী ক্লিন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) গ্র্যাজুয়েট। ২৯ বছর বয়সী ডুভাল, স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআরআই) গবেষক। আরপানেট, পুরো নাম অ্যাডভানসড রিসার্চ প্রজেক্টস নেটওয়ার্কে কাজ করছেন দুজনেই। তহবিলের জোগানদার ছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য, টেলিফোন লাইন ছাড়াই যেন ডেটা আদান-প্রদান করা যায়। এ জন্য ডেটা আদান-প্রদানের কাজে ‘প্যাকেট সুইচিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন তারা। এই ব্যবস্থাই পরবর্তী সময়ে আধুনিক ইন্টারনেটের ভিত্তি তৈরি করে। এ প্রযুক্তি কাজ লাগে কি না, তাই সেদিন প্রথম পরীক্ষা করছিলেন তারা। ভবিষ্যতে তাদের এ পরীক্ষা-নিরীক্ষাই গোটা মানুষ জাতির প্রায় সবকিছুকেই পরিবর্তন করে দেয়। ক্লিন ইউসিএলএর বোয়েলটার হলরুম ৩৪২০ থেকে সাড়ে তিন শ মাইল দূরের ডুভালের সাথে সংযোগের চেষ্টা করছিলেন। লগইন শব্দটি পুরোপুরি টাইপ করার আগেই ডুভালের ফোন এল। জানালেন, কম্পিউটার ব্যবস্থা অচল হয়ে গেছে। ১৯৬৯-এ সেদিন ক্লিন কেবল ‘এল’ এবং ‘ও’ এই দুই ইংরেজি হরফ পাঠাতে পেরেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

টুকটাক কিছু মেরামত সেরে ঘণ্টাখানেক পর আবার সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন তারা। সেদিন তাদের বিশাল অর্জনের পরিপ্রেক্ষিতে কম্পিউটার অচল হয়ে পড়াকে সামান্য ঘটনার পর্যায়ে ফেলা যায়। দুই বিজ্ঞানীর কেউই সেদিন আন্দাজ করতে পারেননি, ওই সময়টা কী বিশাল গুরুত্বের ছিল। ক্লিন খোলাখুলি স্বীকার করেন, গুরুত্বের বিষয়টি আমি মোটেও অনুমান করতে পারিনি। পদ্ধতিটি যেন কাজ করতে পারে, সেদিকেই ছিল পুরো মনোযোগ।

এ ঘটনার ৫৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই দুই বিজ্ঞানীর সাথে আলাপচারিতার শুরু।

বিজ্ঞাপন

আলাপের প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়েছিল, আরপানেটের জন্য তারা যে কম্পিউটার ব্যবহার করেছিলেন, তা কি আকারে বড় এবং শব্দবহুল যন্ত্র ছিল? জবাবে ক্লিন বলেন, সেকালের মাপকাঠিতে কম্পিউটারগুলোকে ছোটখাটোই বলা যায়। এগুলো আকারে একটা ফ্রিজের সমান ছিল। ওই কম্পিউটার শীতল রাখার জন্য কয়েকটা ফ্যান ব্যবহার করা হতো। তাতেই বেশ শব্দ হতো। তবে অন্য কম্পিউটারগুলোর তুলনায় আমাদের সিগমা ৭ কম্পিউটারের ফ্যানগুলোর শব্দ বরং কমই হতো। কম্পিউটারগুলোর সামনে কয়েকটা লাইট ছিল। সেগুলো পিটপিট করত। ইন্টারফেস মেসেজ প্রসেসর বা আইএমপির কাজ নিয়ন্ত্রণের জন্য গুটিকয়েক সুইচও ছিল। পাশাপাশি কাগজের টেপ রিডার ছিল। কম্পিউটারে সফটওয়্যার ঢোকানোর কাজে ব্যবহার হতো ওটি। বাংলা
Sunday November 10, 2024

৫৫ বছর আগে যেভাবে দুই বিজ্ঞানীর ভুল থেকে ইন্টারনেটের জন্ম
ইজেল
সৈয়দ মূসা রেজা
09 November, 2024, 03:15 pm
Last modified: 09 November, 2024, 03:15 pm
facebook sharing buttontwitter sharing buttonwhatsapp sharing buttonemail sharing buttonsms sharing button

ইন্টারনেটে প্রথম বার্তা ছিল মাত্র দুটো অক্ষর—‘এল’ এবং ‘ও’। ছবি: ইমানুয়েল লাফন্ট

১৯৬৯। ২৯ অক্টোবর। সাড়ে তিন শ মাইল দূরে অবস্থিত দুই বিজ্ঞানী তাদের কম্পিউটারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হলেন। একটা বার্তা টাইপ করছিলেন। টাইপের কাজ যখন মাঝ পর্যায়ে, তখনই ঘটল বিপর্যয়। কম্পিউটার অচল হয়ে গেল। ক্রাশ করল। এ ঘটনার ৫৫ বছর পরে, চলতি বছরে, সেই আলাপ বিবিসির স্কট নোভেরের সাথে।

শীতল যুদ্ধ তখন তুঙ্গে। চার্লি ক্লিন এবং বিল ডুভাল প্রতিভার উজ্জ্বল প্রভায় দীপ্যমান দুই তরুণ বিজ্ঞানী তৎকালীন উচ্চাভিলাষী অন্যতম এক গবেষণায় নিমগ্ন হয়ে উঠেছিলেন। ২১ বছর বয়সী ক্লিন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) গ্র্যাজুয়েট। ২৯ বছর বয়সী ডুভাল, স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআরআই) গবেষক। আরপানেট, পুরো নাম অ্যাডভানসড রিসার্চ প্রজেক্টস নেটওয়ার্কে কাজ করছেন দুজনেই। তহবিলের জোগানদার ছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য, টেলিফোন লাইন ছাড়াই যেন ডেটা আদান-প্রদান করা যায়। এ জন্য ডেটা আদান-প্রদানের কাজে ‘প্যাকেট সুইচিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন তারা। এই ব্যবস্থাই পরবর্তী সময়ে আধুনিক ইন্টারনেটের ভিত্তি তৈরি করে।

এ প্রযুক্তি কাজ লাগে কি না, তাই সেদিন প্রথম পরীক্ষা করছিলেন তারা। ভবিষ্যতে তাদের এ পরীক্ষা-নিরীক্ষাই গোটা মানুষ জাতির প্রায় সবকিছুকেই পরিবর্তন করে দেয়।

ক্লিন ইউসিএলএর বোয়েলটার হলরুম ৩৪২০ থেকে সাড়ে তিন শ মাইল দূরের ডুভালের সাথে সংযোগের চেষ্টা করছিলেন। লগইন শব্দটি পুরোপুরি টাইপ করার আগেই ডুভালের ফোন এল। জানালেন, কম্পিউটার ব্যবস্থা অচল হয়ে গেছে। ১৯৬৯-এ সেদিন ক্লিন কেবল ‘এল’ এবং ‘ও’ এই দুই ইংরেজি হরফ পাঠাতে পেরেছিলেন।

টুকটাক কিছু মেরামত সেরে ঘণ্টাখানেক পর আবার সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন তারা। সেদিন তাদের বিশাল অর্জনের পরিপ্রেক্ষিতে কম্পিউটার অচল হয়ে পড়াকে সামান্য ঘটনার পর্যায়ে ফেলা যায়। দুই বিজ্ঞানীর কেউই সেদিন আন্দাজ করতে পারেননি, ওই সময়টা কী বিশাল গুরুত্বের ছিল। ক্লিন খোলাখুলি স্বীকার করেন, গুরুত্বের বিষয়টি আমি মোটেও অনুমান করতে পারিনি। পদ্ধতিটি যেন কাজ করতে পারে, সেদিকেই ছিল পুরো মনোযোগ।

এ ঘটনার ৫৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই দুই বিজ্ঞানীর সাথে আলাপচারিতার শুরু। আলাপের প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়েছিল, আরপানেটের জন্য তারা যে কম্পিউটার ব্যবহার করেছিলেন, তা কি আকারে বড় এবং শব্দবহুল যন্ত্র ছিল? জবাবে ক্লিন বলেন, সেকালের মাপকাঠিতে কম্পিউটারগুলোকে ছোটখাটোই বলা যায়। এগুলো আকারে একটা ফ্রিজের সমান ছিল। ওই কম্পিউটার শীতল রাখার জন্য কয়েকটা ফ্যান ব্যবহার করা হতো। তাতেই বেশ শব্দ হতো। তবে অন্য কম্পিউটারগুলোর তুলনায় আমাদের সিগমা ৭ কম্পিউটারের ফ্যানগুলোর শব্দ বরং কমই হতো। কম্পিউটারগুলোর সামনে কয়েকটা লাইট ছিল। সেগুলো পিটপিট করত। ইন্টারফেস মেসেজ প্রসেসর বা আইএমপির কাজ নিয়ন্ত্রণের জন্য গুটিকয়েক সুইচও ছিল। পাশাপাশি কাগজের টেপ রিডার ছিল। কম্পিউটারে সফটওয়্যার ঢোকানোর কাজে ব্যবহার হতো ওটি। আরপানেটে প্রথম মেসেজ পাঠানো দিয়েই শুরু ইন্টারনেটের। ছবি: ইমানুয়েল লাফন্ট
ডুভাল বলেন, আজকের যুগে বিশাল অনুষ্ঠানের গোটা শব্দব্যবস্থার যন্ত্রপাতি রাখার মতো বড়সড় তাকজুড়ে রাখা হতো ওগুলো। এ ছাড়া এখনকার অ্যাপেল ঘড়িতে যে প্রসেসর বসানো আছে, তার সক্ষমতার থেকেও মিলিয়ন মিলিয়ন বা বিলিয়ন বিলিয়ন গুণ কম ছিল ওসব কম্পিউটারের সক্ষমতাএল এবং ও টাইপ করার বিষয় কথা বলতে গিয়ে ক্লিন বলেন যে আজকের যুগের ওয়েবসাইট বা অন্যান্য ব্যবস্থার সাথে এসআরআই ব্যবস্থার পার্থক্য ছিল। এসআরআই টার্মিনালের সাথে সংযোগ স্থাপন করলেই হবে না। কিছু টাইপ করতে হবে। তাহলেই সংযোগটা কাজ করবে। যদি কোনো প্রোগ্রাম চালানোর ইচ্ছা থাকে, তবে প্রথম লগইন করতে হবে। এ জন্য টাইপ করতে হবে লগইন শব্দটি। সাথে সাথেই কম্পিউটার নাম এবং পাসওয়ার্ড জানতে চাইবে।তিনি আরও জানান, টাইপ করার জন্য টেলিটাইপ মডেল ৩৩ ব্যবহার করা হয়েছিল। এসআরআই ব্যবস্থার কাছে তার টাইপ করা অক্ষর বার্তা হিসেবে যাওয়ার জন্য কয়েকটা ধাপ পেরোতে হতো। কিন্তু ওই সব ধাপ পেরিয়ে গেলে আর বোঝা যাবে না বার্তাটি দূর থেকে এসেছে। বরং স্থানীয় টার্মিনাল থেকে এসেছে বলে ধরে নেবে বিলের কম্পিউটার। একে প্রসেস করবে। তারপর আবার ইসিএলএতে ফেরত পাঠাবে। সেখান থেকে প্রিন্ট করে নেবেন ক্লিন। ক্লিন জানান যে ফোনে তিনি বিলের সাথে যোগাযোগ রাখছিলেন। এল টাইপ করার পর বিলকে জানালেন, এল হরফ তিনি পেয়েছেন। এটা প্রিন্ট করা হয়েছে, সে কথাও জানালেন। তারপর টাইপ করলেন ও অক্ষর। এ পর্যন্ত ভালোভাবেই কাজ এগোচ্ছিল। জি টাইপ করার পরই ঝামেলা দেখা দিল। বিল জানান, তার কম্পিউটার অচল হয়ে গেছে। খানিক পরে আমার ফোন করবে বলেও জানান বিল।এ বিপত্তির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডুভাল জানান, আসলে নেটওয়ার্ক সংযোগ অন্য কিছুর থেকে অনেক বেশি গতিশীল ছিল।তখনকার দিনে স্বাভাবিক সংযোগের গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১০ হরফ। অন্যদিকে আরপানেটের সেকেন্ডে ৫০০০ হরফ পর্যন্ত পাঠানোর তাগদ ছিল। ইউসিএলএ থেকে এসআরআই কম্পিউটার বার্তা পাঠানোর ফল হলো যে বার্তার বন্যায় ভেসে গেল সেখানকার ব্যবস্থা। কারণ, ওখানকার ব্যবস্থা প্রতি সেকেন্ডে ১০টি মাত্র হরফ গ্রহণ করার উপযোগী ছিল। উদাহরণ দিয়ে বলেন, দমকলের আগুন নেভানোর নল দিয়ে তোড়ে আসা পানি দিয়ে গ্লাস ভরতে গেলে যা হবে, এখানেও তা-ই হলো। সমস্যার প্রকৃতি বুঝতে এবং দ্রুত তা সুরাহা করতে বেশি বেগ পেতে হলো না ডুভালের। এক ঘণ্টার মধ্যেই মুশকিল আসান। এর মধ্য দিয়ে যে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে গেল, সে কথা কী বুঝতে পেরেছিলেন সেদিনের তরুণ দুই বিজ্ঞানী? জানতে চাওয়া হলে ক্লিন জবাব দেন সংক্ষেপে। তিনি বলেন, না। অবশ্যই না। তখন এটা বুঝতেই পারিনি। ডুভাল বলেন, সত্যিই বুঝতে পারিনি। এসআরআইতে যে প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছিলাম, এ সফলতা সেখানে বড়সড় প্রভাব ফেলবে বলেই ভাবনা করেন তিনিস্যামুয়েল মোর্স ১৮৪৪ প্রথম টেলিগ্রাম বার্তা পাঠানোর জন্য খানিকটা নাটকীয়তার আশ্রয় নেন। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে পাঠানো তারবার্তায় তিনি লিখেছিলেন, হোয়াট হ্যাথ গড রট (ইশ্বর কি সৃষ্টি করেছেন)। এ ঘটনা উল্লেখ করে দুই বিজ্ঞানীর কাছে জানতে চাওয়া হলো এবারে, যদি পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকত, তবে কী তারা প্রথম পাঠানো বার্তার জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু টাইপ করতেন?ক্লিন বেশ জোর দিয়েই হ্যাঁ সূচক জবাব দেন। তিনি বলেন, যদি এ বার্তার গুরুত্ব তখন আঁচ করতে পারতাম, তবে অবশ্যই তা বদলে দিতাম। কিন্তু তা হয়নি। আমরা কাজটাকে নিয়ে যেন ভালোভাবে উতরে যেতে পারি, তা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ছিলাম। ডুভাল ভিন্নভাবে জবাব দেন। তিনি বলেন, না তা হয়তো করতাম না। পরীক্ষাটাই ছিল বেশ জটিল ব্যবস্থার সাথে জড়িত। এর সাথে চলমান অনেক যন্ত্রাংশ জড়িয়ে ছিল। এ রকম একটা জটিল ব্যবস্থায় প্রথম কাজ করার পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলোই চিত্তাকর্ষক হয়ে উঠেছিল।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত