মঙ্গলবার, মে ১৯, ২০২৬

মানবতা ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবী : মিজানুর রহমান, অক্সফোর্ড

আপডেট:

আমাদের সমাজে সাধারণ মানুষই সবসময় চরম অন্যায়, নিপীড়ন বা অধিকার হরণের শিকার হন, তখন অপরাধী বা অত্যাচারীর প্রতি একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও লেখকের অন্ধ করুণা, দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শনকে ভণ্ডামি মনে হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক। ইতিহাসে এবং বর্তমান সময়ের আলোকেই ভাবনাটিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ন্যায়বিচার বনাম তথাকথিত মানবতা, শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি: অন্যায়কারী বা মানবতা লঙ্ঘনকারীদের প্রতি বিচারহীন সহানুভূতি, সমাজে অপরাধের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।ভণ্ডামির স্বরূপ: তথা গণতন্ত্র ও মানবাধিকার,পদদলিতকারীদের সাধারণ অপরাধী হিসেবে না দেখে তাদের প্রতি মহানুভবতা দেখালে তা ভুক্তভোগীদের সাথে এক ধরণের উপহাসে পরিণত হয়। প্রকৃত মানবতা কখনোই অপরাধীর পক্ষে যায় না, বরং তা সর্বদা নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে শেখায়। বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের দায়িত্ব নিরপেক্ষতার অপব্যবহার নয়, সমাজের বিবেক হিসেবে পরিচিত লেখক বা বক্তারা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান না নিয়ে অতি মানবতার আড়ালে আপোস করেন, তখন তা সমাজকে বিভ্রান্ত করে। ইতিহাসের বিকৃতি করে, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্র হত্যা সহ সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগকে যারা অবজ্ঞা করেছেন তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখালে ইতিহাসের মূল সত্য চরমভাবে ঢাকা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। নৈতিক দ্বিমুখিতা, একইসাথে অত্যাচারীর প্রতি করুণা দেখানো, আবার গণতন্ত্রের গুণগান করা এক ধরণের নৈতিক দ্বিমুখিতা বা দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। একটু পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই বুঝা যায়, সমাজে প্রকৃত নৈতিকতা এবং মেকি সহানুভূতির ভেদাভেদ কেমন। অন্যায়ের মুখে আপোসহীন লেখনী ও মনোভাবই শুধুমাত্র একটি সমাজকে সত্যিকারের মানবিক করে তুলতে পারে। হোক না সেটা মৃত্যুর আগে বা পরের কোন করুন দৃশ্য বা ঘটনা। হোক না সেটা কোন অপরাধীর অপমৃত্যু।সশস্ত্র বিদ্রোহের মতো কর্মকাণ্ড যারা লিপ্ত ছিল, যারা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকির মত কাজ করেছে, যে বা যারা সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম করেছেন, তাদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি হাস্যকর। ন্যায়বিচার তথা সভ্য সমাজে অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তার প্রতি অমানবিক আচরণ না করে সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করাই মানবতা ও যথার্থ নিয়ম। বড়ই সুন্দর কথা! কিন্তু দেশপ্রেমহীন মানুষদের এবং শত্রুরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য পোষণকারীদের মৃত্যুতে যদি আত্মতৃপ্তি না পাবেন, উচ্ছসিত না হবেন তবে আর হবেন কখন? দেশপ্রেমের তীব্রতায় একজন দেশদ্রোহী, গনতন্ত্র হত্যাকারী লুটেরার মৃত্যুতে উল্লাসিত হয়ে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং দৃঢ় বিশ্বাস এবং দেশপ্রেমেরই অংশ। জানি, অনেক সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে সত্যকথা বা সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। কিন্তু নিজেদেরকে সক্রেটিস এর সাথে তুলনা করে কিংবা সক্রেটিস এর উচ্চতায় তুলে ধরবার প্রয়াসে এই সব চিরাচরিত মানবিক কথাগুলো লিখতে শুরু করার পূর্বে একবার ভাবা উচিত। যখন কোন সমাজ কোনো চরম নিষ্ঠুরতা, গণধর্ষণ বা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মুখোমুখি হয়, তখন ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের নির্মম বাস্তবতাকে আড়াল করে তথাকথিত উচ্চমার্গীয় দর্শন বা সাদামাটা ক্ষমার বাণী প্রচার করা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। নিজের পরিবারের ওপর এমন বিপর্যয় না নামা পর্যন্ত অন্যের দুঃখকে স্রেফ তাত্ত্বিক রূপ দেওয়া খুব সহজ। আর সমাজে মুখোশধারী মহামানবদের চরম বাস্তবতা হলো, অপরাধীর মৃত্যুতে তথাকথিত বাণী দিয়ে নিজেদের সমাজে মহান সাব্যস্ত করার এক হীন প্রক্রিয়া। মনে রাখবেন, মানবতার ভুল ব্যাখ্যা বন্ধ করা অপরাধীর পক্ষে সাফাই নয়: অপরাধীকে তার প্রাপ্য শাস্তি না দিয়ে তার প্রতি সহানুভূতি দেখানো মানবতা নয়, বরং ভুক্তভোগীর প্রতি চরম অন্যায়। ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচনে নিজের ওপর আঘাত আসার আগে পর্যন্ত যারা নিরপেক্ষতার বাণী ছড়ানো পছন্দ করেন, তাদের দর্শন আসলে সস্তা আত্মতৃপ্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।সঠিক সহানুভূতির স্থান নির্ধারণে ভুক্তভোগীই প্রথম হওয়া উচিত। মানবতার প্রথম ও প্রধান দাবি হওয়া উচিত। ভুক্তভোগী এবং তার পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, অপরাধের তীব্রতা অনুধাবন করা উচিত। নির্যাতিতা একজন গর্ভবতী পুলিশ অফিসার বা নৃশংসভাবে খুন করে ঝুলিয়ে রাখা ছেলেটির জায়গায় নিজের আপনজনকে কল্পনা করলেই কেবল অপরাধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করা সম্ভব।অপরাধকারী ও অপরাধের উস্কানিদাতারাও শাস্তি পাওয়ার সমান অপরাধী, যারা এই ধরনের কুৎসিত কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত বা সমর্থন করে, তারা সরাসরি অপরাধে অংশ না নিলেও সমাজের আসল এবং গুপ্ত শত্রু। রাষ্ট্রে ন্যায়বিচারই আসল লক্ষ্য, সমাজকে সুন্দর করতে হলে অপরাধী ও তার সমর্থকদের করুণা দেখানো বন্ধ করে কঠোর আইনি ও সামাজিক শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, যে আঘাত নিজের গায়ে লাগেনি, তা নিয়ে দূর থেকে বড় বড় তত্ত্ব দেওয়া সহজ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, ন্যায়বিচার ও সমাজ সংস্কারের জন্য এই সস্তা আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধের কঠোর প্রতিবাদ করা জরুরি। আপনি কি এই ধরনের সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষিতে আপনার কণ্ঠস্বর আরও দৃঢ় করতে চান? নাকি এই মানসিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরির উপায় নিয়ে আলোচনা করতে চান? আপনার উদ্দেশ্য কী? দেশটাকে কোথায় নিয়ে যেতে চান? সুতরাং অপরাধকারী এবং সাহায্যকারী উভয়কেই ঘৃণা করুন, রাষ্ট্রদ্রোহীতার মত অপরাধ থেকে অন্যকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করুন॥

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত