বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্পের ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক বাজারের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের মান্যবর রাষ্ট্রদূত জনাব মোহাম্মদ জুলকার নায়েন। সম্প্রতি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ‘টেকনিক্যাল টেক্সটাইল মেলা’য় অংশগ্রহণ শেষে তিনি জানান, কারিগরি বস্ত্রে আউসবিলডুং (শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণ), উচ্চতর গবেষণা এবং সঠিক বিনিয়োগ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পায়নকে ব্যাপকভাবে উজ্জীবিত করতে পারে। মেলা চলাকালীন তিনি জার্মানির বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের যোগসূত্র স্থাপনের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা ও মতবিনিময় করেন।
বৈশ্বিক বাজারের দ্রুত উত্থান ও কারিগরি বস্ত্রের ১২টি খাত
টেকনিক্যাল টেক্সটাইল বা ‘ফাংশনাল টেক্সটাইল’ (কার্যকরী বস্ত্র)-এর বাজার বিশ্বজুড়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে এর বৈশ্বিক বাজার ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে, যার বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০-১২ শতাংশ।
এই কারিগরি বস্ত্রের ব্যবহারিক ক্ষেত্রকে প্রধানত ১২টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে:
১. অ্যাগ্রোটেক (কৃষি): শেড নেট, মালচ ম্যাট, মাছ ধরার জাল ইত্যাদি।
২. বিল্ডটেক (নির্মাণ): রুফিং মেমব্রেন, স্ক্যাফোল্ডিং নেট ও কংক্রিট রিইনফোর্সমেন্ট।
৩. ক্লথটেক (পোশাক): ইন্টারলাইনিং, সেলাইয়ের সুতা ও জুতার কাপড়।
৪. জিওটেক (জিওটেক্সটাইল): সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাটির স্থিতিশীলতা ও রাস্তা নির্মাণের ড্রেনেজ ফ্যাব্রিক।
৫. হোমটেক (বাড়ি): গৃহসজ্জার সামগ্রী, অগ্নি-প্রতিরোধী পর্দা ও জীবাণু-প্রতিরোধী চাদর।
৬. ইন্ডুটেক (শিল্প): ফিল্টারেশন ফ্যাব্রিক, কনভেয়র বেল্ট ও গ্যাসকেট।
৭. মেডিটেক (চিকিৎসা): সার্জিক্যাল গাউন, ওয়াইপস, ব্যান্ডেজ ও ইমপ্লান্ট।
৮. মোবিলটেক (পরিবহন): এয়ারব্যাগ, সিট বেল্ট ও কেবিনের উপকরণ।
৯. ইকোটেক (পরিবেশগত): দূষণ নিয়ন্ত্রণ ফিল্টার এবং ক্ষয়রোধী ম্যাট।
১০. প্যাকটেক (প্যাকেজিং): বিভিন্ন প্রকার উন্নত বস্তা, ব্যাগ এবং মোড়ক।
১১. প্রোটেক (সুরক্ষামূলক): বুলেটরোধী ভেস্ট, দমকলকর্মীর পোশাক ও রাসায়নিক সুরক্ষা সরঞ্জাম।
১২. স্পোরটেক (ক্রীড়া): সিন্থেটিক টার্ফ, হট-এয়ার বেলুন এবং তাঁবুর সামগ্রী।
দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারের সম্ভাবনা ও উচ্চ প্রযুক্তির রূপান্তর
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে আশার কথা হলো, এ দেশের সহজলভ্য প্রাকৃতিক তন্তু (যেমন- পাট, আনারসের পাতা, কচুরিপানা ইত্যাদি) থেকে আহরিত ফাইবারকে বিভিন্ন কৃত্রিম উপাদান যেমন—আরামিড, কার্বন, পলিয়েস্টার ও নাইলনের সাথে সমন্বয় করে শক্তিশালী অথচ হালকা ওজনের কার্যকরী কাপড় তৈরি করা সম্ভব।
তবে এই খাতটি অত্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর এবং পুঁজিনির্ভর। এখানে সাধারণ শ্রমিকের চেয়ে উচ্চমানের প্রকৌশলী ও কারিগরি পেশাজীবীদের প্রয়োজন বেশি, যারা আধুনিক বুনন ও লেমিনেশন যন্ত্রপাতি পরিচালনা, রাসায়নিক পরীক্ষা, প্রসেস কন্ট্রোল এবং সামগ্রিক মান নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী।
জার্মানিতে আউসবিলডুং (Ausbildung): বাংলাদেশিদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ
জার্মানিতে অটোমোটিভ, মেডিকেল এবং জিও-টেক্সটাইল সেক্টরে আউসবিলডুং বা বৃত্তিমূলক কাজের পাশাপাশি বৃত্তির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের মাঝে এই সেক্টরটি তুলনামূলক কম জনপ্রিয় হওয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা সহজেই এই সুযোগ লুফে নিতে পারেন।
সেরা আউসবিলডুং ক্ষেত্রসমূহ:
টেক্সটাইল প্রোডাকশন মেকানিক (মেশিন স্থাপন ও পর্যবেক্ষণ)
টেক্সটাইল এবং ফ্যাশন টেইলর/সিমস্ট্রেস (উৎপাদন ও সেলাই বিশেষজ্ঞ)
টেক্সটাইল প্রোডাক্ট ডিজাইনার (ডিজাইন ও টেকনিক্যাল ড্রয়িং)
টেক্সটাইল ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট (গুণগত মান ও রাসায়নিক পরীক্ষা)
টেক্সটাইল প্রোডাক্ট ফিনিশার (ডাইং, প্রিন্টিং ও কোটিং বিশেষজ্ঞ)
আবেদনের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া:
আগ্রহী প্রার্থীদের ন্যূনতম বি-ওয়ান (B1) মানের জার্মান ভাষার দক্ষতা থাকতে হবে। মেকানিক্যাল বা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমাধারীরা এতে অগ্রাধিকার পাবেন। তবে সার্টিফিকেট জটিলতা ও গ্রেডিং সিস্টেমের পার্থক্য এড়াতে জার্মানির ANABIN থেকে সমতুল্য সনদ (Equivalence Certificate) নিয়ে আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আগ্রহীরা ট্রিগেমা, টেক্সটিলাকাডেমি এনআরডব্লিউ, ইনোবেল্ট কিংবা সরাসরি Ausbildung.de ও ‘গো টেক্সটাইল!’ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন। সাধারণ তথ্যের জন্য জার্মান ফেডারেল এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সির ZAV-এর সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
জার্মানির ডিআইটিএফ (DITF) এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে কারিগরি টেক্সটাইল খাতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। জার্মানির ‘ইনস্টিটিউট ফর টেকনিক্যাল অ্যান্ড ফাইবার রিসার্চ’ (DITF) বর্তমানে বিমান, নৌ ও মোটরগাড়ি শিল্পের পাশাপাশি ই-টেক্সটাইল, সেন্সর-ভিত্তিক পোশাক এবং বায়োপলিমার নিয়ে কাজ করছে। সম্প্রতি তাদের উদ্ভাবিত NUO FlexHolz এবং FormLig প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া অস্টিওসিন্থেসিস ইমপ্লান্ট ও ডেনিম পণ্যের টেকসই রঙের মতো আধুনিক বিষয়ে তাদের গবেষণা চলমান।
রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশের আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানসমূহ ডিআইটিএফ (DITF)-এর সাথে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নিতে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন। এই প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা দেশের পোশাক খাতকে আগামী দিনে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।
জার্মানীতে বস্ত্রে আউসবিলডুং, শিক্ষা ও কাজের সুযোগ:রাষ্ট্রদূত জুলকার নায়েন
আপডেট:

