সম্পাদকীয় কলাম
প্রধান সম্পাদক
আনোয়ার মোরশেদ মজুমদার (বিটু)
একটি দেশের অভিবাসন ইতিহাসের পাতা ওল্টালে যেমন পাওয়া যায় হাজারো তরুণের স্বপ্নভঙ্গের ও শোষণের নির্মম গল্প, ঠিক তেমনই শেষ পাতায় দেখা মেলে ঘুরে দাঁড়ানোর এক নতুন দিগন্তের। ইউরোপের অন্যতম সুন্দর দেশ ইতালি এবং সেখানে গড়ে ওঠা বাংলাদেশি কমিউনিটির গল্পটাও ঠিক তেমনই এক রোলারকোস্টার জার্নি।নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি, বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের পর থেকে জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় না পাওয়া অনেক বাংলাদেশি ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি জমান ইতালিতে। বিমান কিংবা সমুদ্রপথ—যেকোনো উপায়েই হোক, লক্ষ্য ছিল একটাই: একটুখানি মাথা গোঁজার ঠাঁই আর একটি ‘বৈধ’ জীবনের নিশ্চয়তা। কিন্তু সেই পথ কতটা কণ্টকাকীর্ণ ছিল, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে গিয়ে সাধারণ প্রবাসীরা মুখোমুখি হয়েছেন ইতালীয় মাফিয়াদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও নানামুখী প্রতিবন্ধকতার।
২০০৬ সালের পর থেকে যখন কৃষি ও পর্যটন ভিসায় বাংলাদেশিরা আসতে শুরু করলেন, তখন যুক্ত হলো নতুন সংকট। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেল, কাগজে-কলমে থাকা নিয়োগদাতাদের বাস্তবে কোনো হদিসই নেই! ফলে টিকে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়েই অনেককে বেছে নিতে হয়েছে রাস্তা কিংবা সমুদ্র সৈকতে ফেরি করার মতো অনিশ্চিত জীবন। এই অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটে ২০১০ সালের সাধারণ ক্ষমার (Sanatoria) মাধ্যমে, যা হাজারো বাংলাদেশিকে বৈধ জীবনের আলো দেখায়। তবে এর মধ্যেও কিছু অসাধু চক্রের ও মাফিয়াদের যোগসাজশে কৃষি শ্রমিকদের সাথে প্রতারণার কারণে অনেকেরই বৈধ হওয়ার স্বপ্ন চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়।
সংকটের মেঘ কেটে সম্ভাবনার নতুন সূর্য
অতীতের সেই অন্ধকার টানেল পার হয়ে আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ইতালিতে বাংলাদেশি কর্মীদের অবস্থান এক অভূতপূর্ব ও ইতিবাচক মোড় নিয়েছে। যেখানে একসময় ‘অবৈধ’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’র তকমা সাঁটা থাকতো, আজ সেখানে খোদ ইতালির সরকার বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা, পরিশ্রম আর বিশ্বাসযোগ্যতার জয়গান গাইছে।
ইতালির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং সরকারের নতুন নীতি সেই সুনামেরই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি:Decreto Flussi (২০২৬–২০২৮): ইতালির নতুন ফ্লুসি পরিকল্পনায় প্রায় ৫ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। কৃষি, পর্যটন ও নির্মাণ খাতের এই বিশাল শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী মেলোনির ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি: প্রধানমন্ত্রী মেলোনি স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন, বাংলাদেশি কর্মীদের বাজারে যথেষ্ট সুনাম রয়েছে এবং তাঁর সরকার বাংলাদেশ থেকে বৈধ উপায়ে কর্মী আসাকে জোরালো সমর্থন করে।দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা (MoU): বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন জোরদারে ‘Migration and Mobility’ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে, যা কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার তালিকায় নিয়ে আসবে।
আমাদের করণীয়: অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা
ইতালি সরকারের এই ইতিবাচক বার্তা বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং নতুন অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য এক বিশাল সুযোগ। তবে এই সুযোগ ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি এখন আমাদের নিজেদের হাতেই।
সতর্কবার্তা ও দিকনির্দেশনা:দালাল ও মাফিয়া চক্রকে ‘না’ বলুন: অতীতের মতো কোনো ভুয়ো নিয়োগদাতা বা প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ ও দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করবেন না।শুধুমাত্র বৈধ প্রক্রিয়ায় আবেদন: ইতালির আইন ও সরকারি নিয়ম মেনে সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে আবেদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন।
দক্ষতা অর্জন: ইতালির শ্রমবাজার এখন দক্ষ ও পেশাদার কর্মী খোঁজে। তাই নিজেকে নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ করে গড়ে তোলার পাশাপাশি ভাষা শেখার ওপর জোর দিন।ইতালিতে বাংলাদেশি অভিবাসনের ইতিহাস যদি হয় লড়াই ও টিকে থাকার, তবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হোক মর্যাদা, বৈধতা আর সফলতার। ইতালি সরকারের এই বাড়িয়ে দেওয়া হাতকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে সততা ও যোগ্যতার সাথে। তবেই ঘুচবে অতীতের সব গ্লানি, প্রতিষ্ঠিত হবে এক গৌরবময় বাংলাদেশি কমিউনিটি।

