ফেনী পৌরসভার জলাবদ্ধতা—পরিকল্পনার অভাব নাকি নাগরিক উদাসীনতা?
ফেনী শহরবাসীর জন্য বৃষ্টি এখন আর আশীর্বাদ নয়, বরং এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে পৌরসভার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে জনবহুল মার্কেটগুলো। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ছে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ পৌঁছাচ্ছে চরমে। কিন্তু কেন এই চিরচেনা সংকট? এর গভীরে তাকালে দেখা যায়—অবৈধ দখলদারি, নাগরিক অসচেতনতা এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার এক ত্রিমুখী সমীকরণ।
খাল দখল: এক নিরব ঘাতক
ফেনী শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ছিল শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া খালগুলো। অথচ আজ সেসব খালের অস্তিত্ব সংকটে। প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্বের কারণে খালগুলো সরু নালায় পরিণত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রকাশ্য দখলবাজি নিয়ে তথাকথিত অনেক ‘মোবাইল সাংবাদিক’ বা কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের কোনো জোরালো ভূমিকা দেখা যায় না। তারা সস্তা ভিউ আর লাইকের নেশায় জলাবদ্ধতার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত থাকলেও, সমস্যার মূলে গিয়ে ‘খাল দখলদার’দের মুখোশ উন্মোচন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। জনস্বার্থের চেয়ে যখন সস্তা প্রচার বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন মূল সমস্যাটি আড়ালেই থেকে যায়।
পলিথিন বর্জ্য ও ড্রেনেজ সিস্টেমের মৃত্যু
জলাবদ্ধতার দ্বিতীয় এবং অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য। সাধারণ মানুষ যত্রতত্র প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন ড্রেনে নিক্ষেপ করছে। এই বর্জ্যগুলো ড্রেনের মুখে স্তূপ হয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দিচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, নিজের ফেলা একটি পলিথিন ব্যাগ শেষ পর্যন্ত নিজের ঘরের দরজাতেই পানি নিয়ে আসছে।
পৌরসভা কি দায় এড়াতে পারে?
পলিথিন ফেলা নাগরিক অসচেতনতা হতে পারে, কিন্তু সেই ড্রেন পরিষ্কার রাখা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করা সরাসরি পৌরসভার দায়িত্ব। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করা এবং ড্রেনেজ সিস্টেমের ত্রুটিপূর্ণ নকশাও এই ভোগান্তির জন্য সমানভাবে দায়ী। খাল উদ্ধারে কঠোর অবস্থান নিতে না পারা এবং বর্জ্য অপসারণে দীর্ঘসূত্রতা পৌরসভার সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
সমাধানের পথ কী?
ফেনী পৌরসভাকে একটি বাসযোগ্য শহর হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন:
খাল উদ্ধার: কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের তোয়াক্কা না করে দখল হয়ে যাওয়া খালগুলো উদ্ধার করে খনন করতে হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ড্রেনে পলিথিন ফেলা বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার নিশ্চিত করতে হবে।
সচেতন সাংবাদিকতা: ভিডিও করে ভিউ বাড়ানো নয়, বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকদের উচিত খালের ম্যাপ ধরে অনুসন্ধান করা এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা।
জলাবদ্ধতা মুক্ত ফেনী গড়া কেবল পৌরসভার একার কাজ নয়, আবার কেবল জনগণের সচেতনতাতেও এটি সম্ভব নয়। প্রশাসন এবং নাগরিকের যৌথ প্রচেষ্টাই পারে ফেনী শহরকে এই ‘জলমগ্ন অভিশাপ’ থেকে মুক্তি দিতে।
ফেনী পৌরসভার জলাবদ্ধতা—পরিকল্পনার অভাব নাকি নাগরিক উদাসীনতা?
আপডেট:

