সাম্প্রতিক সময়ে ১১ বছরের এক মাদ্রাসা ছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাটি কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। যেকোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষের হৃদয়ে এ ঘটনা রক্তক্ষরণ ঘটানোই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, যখন কোনো স্পর্শকাতর ঘটনা সামনে আসে, তখন আইনি তদন্তের আগেই তথাকথিত ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ শুরু হয়ে যাওয়াটা কতটা যৌক্তিক? বিশেষ করে যখন কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বা ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে টার্গেট করে ঢালাওভাবে আক্রমণ চালানো হয়, তখন বিচার পাওয়ার চেয়ে বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়টিই মুখ্য হয়ে ওঠে।
বিচারের আগেই অপরাধী সাব্যস্ত করার প্রবণতা
আমাদের দেশে বর্তমানে কোনো অভিযোগ ওঠার সাথে সাথেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও এক শ্রেণীর মিডিয়া সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের তোয়াক্কা না করেই বিচারকের আসনে বসে পড়ে। অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী কি না, তা আদালতের রায়ের আগে নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব। অথচ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই দাড়ি-টুপি আর মাদ্রাসা শিক্ষাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। এটি কেবল অন্যায্য নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত অপপ্রচার হিসেবেও প্রতীয়মান হয়। যদি কোনো স্কুল শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আসত, তবে কি পুরো স্কুল ব্যবস্থাকে সংস্কারের দাবি তোলা হতো? এই দ্বিমুখী আচরণই প্রমাণ করে যে, এখানে অপরাধ দমনের চেয়ে আদর্শিক আক্রমণই মুখ্য।
অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থন ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন
অভিযুক্ত শিক্ষক প্রকাশ্যে এসে যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, তা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন:
দীর্ঘ অনুপস্থিতি: মেয়েটি গত ৫-৬ মাস মাদ্রাসায় ছিল না। এই দীর্ঘ সময়ে সে কার সাথে ছিল বা কোথায় ছিল, তার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত কি হয়েছে?
পারিবারিক জটিলতা: মেয়েটির মা ও সৎ বাবার সাথে ঢাকায় থাকা এবং নানার মাধ্যমে গ্রামে ফিরে আসার পেছনের পারিবারিক টানাপড়েন কি এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত?
আচরণগত দিক: অভিযুক্তের দাবি অনুযায়ী মেয়েটির আচরণ ও পারিবারিক পরিবেশ (নানার সাথে ঘুমানো ইত্যাদি) কি পুলিশি জেরার আওতায় এসেছে?
একজন মানুষ যদি সত্যিই অপরাধী হতো, তবে কি সে নিজ থেকে ডিএনএ টেস্ট (DNA Test) করার মতো বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতো? সাধারণত প্রকৃত অপরাধীরা আত্মগোপনের চেষ্টা করে, কিন্তু এখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি বিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়ে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের লড়াই করছেন।
ডিএনএ টেস্ট ও অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা
যেকোনো ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের মামলায় আবেগ নয়, বরং প্রমাণই শেষ কথা। ডিএনএ টেস্ট এমন একটি পদ্ধতি যা প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করতে ভুল করে না। যদি ডিএনএ রিপোর্টে ওই শিক্ষক নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে এই যে গণমাধ্যমের মাধ্যমে তাকে সামাজিকভাবে মৃত ঘোষণা করা হলো, তার দায়ভার কে নেবে? সামাজিক এই কলঙ্ক কি কোনোভাবে মুছে দেওয়া সম্ভব?
ধর্ষণ একটি জঘন্যতম অপরাধ। অপরাধী যে-ই হোক—চাই সে শিক্ষক হোক বা নিকটাত্মীয়—তার একমাত্র প্রাপ্য হলো ফাঁসী। কিন্তু অপরাধ প্রমাণের আগে নিরপরাধ কাউকে বলি দেওয়াও কি বড় অপরাধ নয়? একই সাথে যারা ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করতে মিথ্যা অভিযোগ করে এবং যারা তিলকে তাল করে মিডিয়া ট্রায়াল চালায়, তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।
আমাদের দাবি হওয়া উচিত:
১. কোনো প্রকার পক্ষপাত ছাড়াই দ্রুত এবং স্বচ্ছ আইনি তদন্ত নিশ্চিত করা।
২. অবিলম্বে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করা।
৩. যদি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে অভিযোগকারী এবং সত্য যাচাই না করে বিষদগার করা মিডিয়া কর্মীদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের মতো কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি করা।
আসুন, হুজুগে না মেতে তথ্যের সত্যতা যাচাই করি। সত্য কঠিন হতে পারে, কিন্তু সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখাটাই সভ্য সমাজের পরিচয়।
১১ বছরের শিশু অন্তঃসত্ত্বা মিডিয়া ট্রায়াল ও ন্যায়বিচারের সংকট: সত্যের আড়ালে কি অন্য কিছু?
আপডেট:

