শনিবার, মার্চ ১৪, ২০২৬

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটি বেঁচে থাকার কথা নয় –আবু আহমেদ

আপডেট:

আবু আহমেদ, অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ। ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান। অধ্যাপক আবু আহমেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন। তিনি সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের (বর্তমানে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি) পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ পরিবেশ, আইসিবি নিয়ে তার পরিকল্পনা ও সাম্প্রতিক অর্থনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিমআপনি ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। বিনিয়োগ সম্প্রসারণে এখন পর্যন্ত কী কী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে?বিগত সরকারের আমলে গত ১৫ বছরে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সেগুলো থেকে তেমন কোনো রিটার্ন আসেনি। এমনকি আইসিবির মতো একটি ভালো প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এ প্রতিষ্ঠানকে কেউ ঠিক করতে পারবে না। কারণ ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি পোর্টফোলিওতে এসেছে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জাঙ্ক স্টক, যার ৭৭ শতাংশই নেই অর্থাৎ ক্ষয় হয়ে গেছে। আবার এগুলো উচ্চ সুদে ঋণ করা অর্থ। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকও রয়েছে। যখন আইসিবির প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার মতো উদ্বৃত্ত ছিল। এর কিছু অর্থ ব্যাংকে রাখা হয়েছিল। তবে এ অর্থ এখন আইসিবি পাচ্ছে না। নিজের অর্থই ব্যাংক থেকে পাচ্ছে না, আবার বাজারকে সহায়তার জন্য উচ্চ সুদে টাকা আনছে আইসিবি। এ টাকার বিষয়ে কর্মকর্তাদের যখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম তখন তারা বলেছে, সেই সময় তারা এটি করতে বাধ্য হয়েছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ বাইরের প্রভাবশালীরা চেয়েছিল। তারাই এগুলো এনে বিক্রি করেছে এবং তারাই এক সময় অর্থায়নের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আমাদের শুধু সেগুলো নিতে হয়েছে। কিন্তু আইসিবির কোনো লাভ হয়নি। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি বেঁচে থাকার কথা নয়। সম্প্রতি আইসিবিকে ৩ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। তাতে আইসিবি কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?আইসিবিকে বাঁচানোর জন্যই এ অর্থ দেয়া হয়েছে। আইসিবির দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখলাম প্রতিষ্ঠানটি ডুবে যাচ্ছে। কে নেতৃত্বে আছে সেটা বিষয় নয়, এটিকে ওপরে ওঠানোর কোনো সুযোগ দেখছি না। প্রতিষ্ঠানের সূচকগুলো খুবই নাজুক, এটি দ্রুত ঠিক করা কঠিন। প্রতিষ্ঠানের সার্বিক অবস্থা অর্থ উপদেষ্টাকে অবহিত করেছি এবং বলেছি পুঁজিবাজারে আইসিবির সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হলে এটিকে বাঁচাতে হবে। সরকারি এ প্রতিষ্ঠান ১৯৭৬ সালে বিশেষ কিছু উদ্দেশ্য সাধনকল্পে স্থাপন করা হয়েছে। যখন এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তখন মূলধন বাজার খুব ছোট ছিল। তবে প্রতিষ্ঠাতাদের দূরদর্শিতা ছিল। এর অন্যতম কাজ ছিল ক্যাপিটাল মার্কেট ও ইকুইটি মার্কেটকে সহায়তা করা, আইপিও আনা এবং আন্ডার রাইটিং, ব্রিজ ফাইন্যান্সিং ও মিউচুয়াল ফান্ডিং করাসহ বিভিন্ন কাজ করা। এখনো প্রতিষ্ঠানটি এসব কাজই করে। যদিও তার কাজের পরিসর অনেক সংকুচিত হয়ে পড়েছে।বিভিন্ন জায়গায় আইসিবির যে বিনিয়োগ রয়েছে তা কি প্রত্যাহার করবেন?এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রত্যাহার করতে গেলে যাদের টাকা দেয়া হয়েছে তারা টাকা ফেরত দিচ্ছে না। এ বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং এ বিষয়ে কাজ করছি। আরেকটি হলো জেড ক্যাটাগরি ইচ্ছা করলেও প্রত্যাহার করা যায় না। তবে এখন সবাই প্রত্যাশা করছে মার্কেটটি যেন ভালো হয়, সেজন্য অপেক্ষা করছে। আবার কমার্শিয়াল অডিট বাধা দেবে। তার পরও আমরা কিছু শেয়ার বোর্ডে নিয়ে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর কমার্শিয়াল অডিটের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হোক। কারণ এসব নিয়ে বসে থাকলে আরো ক্ষতি হবে। এর মূলধন ব্যয় তো আছে। ৯ শতাংশ সুদে আইসিবি বন্ড ইস্যু করেছে। কিন্তু ৭ শতাংশ সুদে অন্যান্য উৎস থেকে বন্ড ক্রয় করেছে। বেশি রেটে ইস্যু করছে এবং কম রেটে ক্রয় করছে—এ ধরনের ব্যবধান কি কোনো বিনিয়োগ বা অর্থনীতিতে সমর্থনযোগ্য? যা-ই হোক এসব অতীতে হয়েছে। দেশে ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক যেভাবে লুণ্ঠিত হয়েছে, ঠিক একইভাবে আইসিবিও লুণ্ঠিত হয়েছে। যদিও লুণ্ঠনের ধরন ভিন্ন। যদি এখন আইসিবিকে বাঁচিয়ে না রাখা যায় তাহলে সেটি পুঁজিবাজারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। মাননীয় অর্থ উপদেষ্টা আইসিবিকে ৪ শতাংশে রেটে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। অর্থ উপদেষ্টা এখানে দ্রুততার সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এজন্য তিনি সাধুবাদ প্রাপ্য।সরকার থেকে পাওয়া এ অর্থ কীভাবে ব্যয় করবেন?অর্থ ব্যয়ের জন্য দুটি কর্মপরিকল্পনা দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ঋণ পরিশোধ। প্রাপ্য অর্থের একটা বড় অংশ হয়তো ঋণ পরিশোধেই যাবে। বিষয়টি বোর্ড ও কমিটির যারা রয়েছেন তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা সভরিন গ্যারান্টি নামে আলাদা একটি বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) অ্যাকাউন্ট খুলেছি, যাতে এ অর্থের আলাদা হিসাব রাখা যায়। যেসব ঋণ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে কোন ঋণটি আগে শোধ করতে হবে তার একটি কর্মপরিকল্পনা করতে বলেছি। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি আইসিবির ঋণের সুদ মাফ করে দেয় তাহলে একসঙ্গে টাকা শোধ করা সম্ভব হবে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান আইসিবির সুদ মওকুফ করবে বলে মনে হয় না। এছাড়া ছোট অংকের যেসব পাওনা রয়েছে সেগুলোও দিয়ে দেয়া হবে। অর্থনীতি যদি গতিশীল না হয় তাহলে আইসিবিকে লভ্যাংশ দিয়েই বাঁচতে হবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের যেসব উচ্চ লভ্যাংশের স্টক আছে তা বাছাই করতে হবে এবং সেদিকে যেতে হবে। এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া আছে। এ নিয়ে একটি কমিটি কাজ করছে এবং তারা নিয়মিত প্রতিবেদন দেবে। তবে আমি নিজেই কঠোরভাবে এটি তদারকি করব।পুঁজিবাজারের উন্নয়নে আইসিবির ভূমিকা আছে। আপনি পুঁজিবাজারের পরিচিত মুখ। পুঁজিবাজারের জন্য আইসিবির পক্ষ থেকে কি পদক্ষেপ আশা করতে পারি?পুঁজিবাজারে ব্রিজ ফাইন্যান্সিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু যারা ব্রিজ ফাইন্যান্সিং করেছে তারা এখনো টাকা পাচ্ছে না। সেসব প্রকল্প এখনো ভালো হয়নি।আপনি সবসময় বলেন, পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি আসে না। ভালো কোম্পানি আনতে কী পদক্ষেপ নেবেন?

তথ্য সুত্র : বনিকবার্তা

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত