বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৬, ২০২৬

ইসরাইল-তুরস্ক মুখোমুখি সংঘর্ষের পথে

আপডেট:

প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের পতনের পর দেশটি নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সিরিয়ার ভেতরেই নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতিতেও পড়ছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় তুরস্ক ও ইসরাইলের স্বার্থবিরোধের কারণে তাদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, যা সঙ্ঘর্ষের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরাসিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের পতনের পর দেশটি নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সিরিয়ার ভেতরেই নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতিতেও পড়ছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় তুরস্ক ও ইসরাইলের স্বার্থবিরোধের কারণে তাদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, যা সঙ্ঘর্ষের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।তুরস্কের লক্ষ্য ঐক্যবদ্ধ সিরিয়া, ইসরাইলের সন্দেহ দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘদিন ধরে আসাদ-বিরোধী বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে আসা তুরস্ক সিরিয়ায় একটি স্থিতিশীল ও ঐক্যবদ্ধ সরকার দেখতে চায়, যেখানে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার পুরো দেশ পরিচালনা করবে। এ লক্ষ্যে নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) এবং সিরিয়ার সেনাবাহিনীর মধ্যে সমঝোতা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে।অন্যদিকে, এই নতুন সরকারকে সন্দেহের চোখে দেখছে ইসরাইল। ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার ইসলামপন্থী সম্পর্ক রয়েছে, যা ভবিষ্যতে ইসরাইলের জন্য হুমকি হতে পারে। পাশাপাশি দামেস্কের উপর তুরস্কের প্রভাব ইসরাইলের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক আসলি আইদিনতাসবাস বলেন, ‘সিরিয়াকে নিয়ে তুরস্ক ও ইসরাইল প্রক্সিযুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। দুই দেশই একে অপরকে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে এবং বর্তমানে তারা বিপজ্জনক এক সঙ্ঘাতময় গতিপথে রয়েছে।সিরিয়ায় ইসরাইলের আগ্রাসন ও তুরস্কের উদ্বেগ
আসাদের পতনের পর ইসরাইল দক্ষিণ সিরিয়ার কিছু এলাকা দখল করে নিয়েছে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শত্রু গোষ্ঠীগুলোকে সীমান্ত থেকে দূরে রাখতে করা হয়েছে। তবে সিরিয়ার নতুন সরকার ও জাতিসঙ্ঘ এই অনুপ্রবেশকে ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে এবং ইসরাইলকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।এছাড়া ইসরাইল সিরিয়ার পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছে। তারা দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, তুরস্ক উত্তর সিরিয়ায় তার সামরিক উপস্থিতি আরো বিস্তৃত করতে পারে, যা ইসরাইলের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।তুরস্ক ২০১৬ সাল থেকে সিরিয়ার কুর্দি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। এই পরিস্থিতি ইসরাইলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, কারণ তুরস্ক এখন সিরিয়ায় আরো শক্ত অবস্থান নিচ্ছে।
ইসরাইলের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ও সাম্প্রতিক সঙ্ঘাত
সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন সরকারের সমর্থকদের সাথে আসাদপন্থী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ দেখা গেছে। এতে শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। ইসরাইল এই সহিংসতাকে ‘জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্বাধীন জাতিগত নির্মূল’ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং নতুন সিরিয়া সরকারকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছে।
এছাড়া ইসরাইলি কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে তারা দামেস্কের দক্ষিণে সিরিয়ার সামরিক উপস্থিতি মেনে নেবে না। ইসরাইল ও সিরিয়ায় বসবাসরত দ্রুজ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষার অজুহাতে ইসরাইল দামেস্কের একটি উপকণ্ঠে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছে।
তুরস্ক-ইসরাইল সম্পর্কের ক্রমাবনতি ও আঞ্চলিক অস্থিরতা, একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক ও ইসরাইলের সম্পর্ক অবনতির দিকে গেছে। বিশেষ করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যিব এরদোগান ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের কড়া সমালোচক। গাজায় ইসরাইলের সামরিক হামলার প্রতিবাদে তুরস্ক সম্প্রতি ইসরাইলের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার আনা মামলায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইল এখন সিরিয়ায় কুর্দি, দ্রুজ এবং আলাউই সম্প্রদায়ের স্বায়ত্তশাসনের দাবি সমর্থন করছে, যা তুরস্কের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। এরদোগান সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যারা সিরিয়ার অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়, তারা সফল হবে না।ইসরাইল-তুরস্ক মুখোমুখি সংঘর্ষের পথে?তুরস্ক সিরিয়ার অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে, অন্যদিকে ইসরাইলও দক্ষিণ সিরিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সঙ্ঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।বিশ্লেষক আসলি আইদিনতাসবাস বলেন, ‘তুরস্ক ও ইসরাইল আগে একে অপরের বিরোধিতা করলেও, তারা সরাসরি সঙ্ঘর্ষে জড়ায়নি। কিন্তু এখন তারা সক্রিয়ভাবে একে অপরকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। প্রশ্ন হলো, তারা কি একে অপরের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন?ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের উচিত তুরস্কের সাথে আলোচনায় বসা। কারণ তুরস্কই এখন সিরিয়ার নতুন সরকারের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখতে পারে।সিরিয়ার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। দেশটির রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তুরস্ক ও ইসরাইল সরাসরি সঙ্ঘাতের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর এই উত্তেজনা শুধু সিরিয়াকেই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকেই এক নতুন সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের দিকে গড়াবে, নাকি কূটনৈতিক সমঝোতায় উপনীত হবে? সময়ই এর উত্তর দেবে।

সূত্র : এপি

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত