দখলদারদের হিংস্রতায় কাঁদছে দেশের শত নদ নদী। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে প্রভাবশালীরা নদীর তীর দখল করে নির্মাণ করেছে বাণিজ্যিক কারখানা, জেটি, তেলের বার্জ, বরফকল, কোল্ড স্টোরেজ, ফিশিং অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডকইয়ার্ড, মাছের আড়ত, বসতঘর ট্রাক স্ট্যান্ড আরো কত কী। নিয়ন্ত্রণহীন এমন দখলে ¯্রােতস্বিনী নদীগুলো এখন মৃত প্রায়। এর মধ্যে সরেজমিনে কক্সবাজারের বাঁকখালী নদী দেখে হতবাক হয়েছেন দুই উপদেষ্টা। তারা তাৎক্ষণিক এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।ভরাট হয়ে যাওয়া এসব নদীর বুকে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন, পথঘাট, পার্কসহ নানা আধুনিক স্থাপনা। এ কারণে দেশে নদ-নদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তেমনি বড় হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য।একাধিক সংস্থার নদী গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, মানবসৃষ্ট কারণে গত চার যুগে দেশের শত নদী বিলীন হওয়ার সাথে মৃত্যুর প্রহর গুণছে কয়েক শ’ নদী। বর্ষায় এসব নদীতে পানি নামলেও শীত মওসুমে সব শুকিয়ে যায়। সেই সুযোগে নদীগুলো দখল করে স্থাপনা গড়ছে প্রভাবশালীরা। ফলে প্রতি বছর নদীগুলো সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। অন্য দিকে ফারাক্কা বাঁধ ও উজানে বাঁধ দিয়ে পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়ার কারণেও অনেক নদীর মৃত্যু ঘটছে। এ ছাড়া নদীতে প্রতি বছর পলি জমায় তার স্রোত কমে যাচ্ছে। ফলে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে এখন প্রায় মৃত অবস্থায় যেসব নদী রয়েছে তার অন্যতম ময়মনসিংহের পুরনো ব্রহ্মপুত্র, নেত্রকোনার মগড়া, কংস, সোমেশ্বরী, খুলনার রূপসা, শিবসা, ডাকি, আত্রাই, ফরিদপুরের কুমার, বগুড়ার করতোয়া, কুমিল্লার গোমতি, পিরোজপুরের বলেশ্বর, যশোরের ভৈরব, কপোতাক্ষ, ইছামতি, বেতনা, মুক্তেশ্বরী, কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা, ঘোড়াউত্রা, ফুলেশ্বরী, রাজবাড়ীর হড়াই, কুড়িগ্রামের ধরলা, গাইবান্ধার ঘাঘট, বান্দরবানের সাঙ্গু, খাগড়াছড়ির চেঙ্গী, নওগাঁর আত্রাই এবং জামালপুরের ঝিনাই নদী। এক সময় স্রোতস্বিনী এসব নদী এখন খালে পরিণত হয়েছে।
অন্য দিকে ঢাকার চার দিকে তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীও এখন দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। নদীগুলোর দুই ধারে গড়ে ওঠা শিল্প কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যরে বিষক্রিয়ায় এসব নদী প্রাণহীন হয়ে পড়েছে।এ দিকে কক্সবাজারের বাঁকখালী নদী দখলে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। নদীটি এখন প্রায় মৃত অবস্থায় আছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও নদীর দুই পাশের প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় শত শত স্থাপনা গড়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে নদীর এমন করুণ অবস্থা দেখে বিস্মিত হয়েছেন দুই উপদেষ্টা। এ সময় নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমি বন্দর করব, বাকিরা দখল করবে, তা হতে পারে না। নদীর নির্ধারিত সীমানা গেজেটে রয়েছে। অবৈধ দখলদারদের সরে যেতে বলা হয়েছে, কিন্তু তারা সরছে না। তারা না সরলে উচ্ছেদ করা হবে। নদীর তীর দখল উচ্ছেদ দ্রুতই হবে।অন্য দিকে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাংবাদিকদের জানান, শিগগিরই অবৈধভাবে দখলকৃত সব সরকারি ভূমি মুক্ত করা হবে। বিভিন্ন সংস্থার জন্য বরাদ্দকৃত কক্সবাজারের প্রায় ১২ হাজার একর বনভূমি বন বিভাগের কাছে ফেরত দেয়া হচ্ছে। কক্সবাজারের নদী, বনভূমি ও সি-বিচ দখল ও দূষণমুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) অনুমতি ছাড়া কোনো কিছু নির্মাণ করা যাবে না। পরিবেশ অধিদফতর, বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি বা বেসরকারি নির্মাণ বিবেচনায় নেয়া হবে না।কক্সবাজারের ৭০০ একর বনভূমি ইতোমধ্যেই উদ্ধার করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তি মালিকানায় নেয়া ও ফুটবল একাডেমির জন্য বরাদ্দ জমি ফেরত আনা হচ্ছে। সোনাদিয়া দ্বীপে বেজার জন্য বরাদ্দকৃত জমিও বন বিভাগের আওতায় ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলছে।

