ইতালির রাজধানী রোমের তোর সাপিয়েনজা (Tor Sapienza) ইমিগ্রেশন অফিসের সামনের দৃশ্যগুলো কেবল অভিবাসন সংকটের চিত্র নয়, বরং আধুনিক ইউরোপের বুকে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের দলিল। প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ—যাদের বড় অংশই বাংলাদেশি এবং উত্তর আফ্রিকান তরুণ—খোলা আকাশের নিচে, কনকনে শীত আর রোদ উপেক্ষা করে ফুটপাতে দিনরাত পার করছেন। চার-পাঁচ দিন ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩০-৫০ জনের ভাগ্যে জুটছে আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ। এই দৃশ্য যেমন অমানবিক, তেমনি একটি উন্নত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য চরম অবমাননাকর।সংকটের মূলে অব্যবস্থাপনা ও দালালের দৌরাত্ম্য এই পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী ইতালির বর্তমান অভিবাসন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেমের অনুপস্থিতি। ডিজিটাল যুগে যখন বিশ্ব হাতের মুঠোয়, তখন হাজার হাজার মানুষকে সশরীরে ফুটপাতে রাত কাটাতে বাধ্য করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘দেক্রেতো ফ্লুসি’ (Decreto Flussi) বা সিজনাল ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে অসাধু দালালদের রমরমা বাণিজ্য। অনেক প্রবাসী দালালের খপ্পরে পড়ে বিপুল অর্থ খুইয়ে বৈধতার পথ না পেয়ে শেষ সম্বল হিসেবে রাজনৈতিক আশ্রয়ের (Asylum) দিকে ঝুঁকছেন। এই বিশাল চাপের বিপরীতে ইমিগ্রেশন অফিসের জনবল সংকট ও ধীরগতি পরিস্থিতিকে নরকে পরিণত করেছে।
রাষ্ট্রের দ্বিচারিতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাতারেল্লা একাধিকবার স্বীকার করেছেন যে, অভিবাসীরা ইতালির অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। একদিকে দেশের জিডিপিতে অভিবাসীদের শ্রমের প্রয়োজন অনস্বীকার্য, অন্যদিকে সেই শ্রমজীবী মানুষগুলোকে ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র।দীর্ঘসূত্রতা: একটি রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রক্রিয়া শেষ হতে দুই বছরেরও বেশি সময় লাগছে। এই দীর্ঘ সময় একজন মানুষ কাজহীন, পরিচয়হীন এবং অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।মানবিক সহায়তা: রেড ক্রস বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো কম্বল বা খাবার দিয়ে যে সহায়তা করছে, তা মূলত রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা মাত্র। শীতের রাতে ফুটপাতে ঘুমানো তরুণদের এই অবস্থা কোনো সভ্য দেশের চিত্র হতে পারে না।
আশু করণীয় ও প্রতিকার
ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবিক মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে ইতালিকে এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রশ্ন—এই অমানবিক ব্যবস্থার দায়ভার শেষ পর্যন্ত কার?
১. ডিজিটালাইজেশন: অতিদ্রুত অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম চালু করতে হবে যাতে মানুষকে রাস্তায় রাত কাটাতে না হয়।
২. জনবল বৃদ্ধি: ইমিগ্রেশন অফিসগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দিয়ে দৈনিক আবেদনের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।
৩. দালাল নির্মূল: ‘দেক্রেতো ফ্লুসি’ নিয়ে যে জালিয়াতি চলছে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. ইইউ হস্তক্ষেপ: ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত ইতালির এই সংকট নিরসনে নীতিগত ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা, যাতে মানবিক বিপর্যয় এড়ানো যায়।
পরিশেষে, অভিবাসীরা করুণার পাত্র নন; তারা শ্রম এবং স্বপ্ন নিয়ে একটি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে আসেন। রোমের ফুটপাতে তাদের এই মানবেতর জীবনযাপন অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। প্রেসিডেন্ট মাতারেল্লার বক্তব্য যদি সত্যি হয়, তবে সেই অর্থনীতির কারিগরদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ আরও সংবেদনশীল ও সম্মানজনক হওয়া বাঞ্ছনীয়। ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, নতুবা এই স্থবিরতা কেবল অভিবাসীদের জন্যই নয়, বরং ইতালির সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর জন্যও বড় কলঙ্ক হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশী লাতিনা আমেরিকার ও আফ্রিকার অভিবাসীদের রোমের ফুটপাতে মানবিকতার চরম বিপর্যয়—দায়ী কে?
আপডেট:

