ইউরোপজুড়ে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থানের ধারাবাহিকতায় ইতালিতে বসবাসরত অভিবাসীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি দেশটির একটি কট্টর ডানপন্থী নাগরিক সংগঠন ‘রেমিগ্রেশন অ্যান্ড রিকনকোয়েস্ট’ (Remigration and Reconquest) নামক একটি চরম বিতর্কিত ও অভিবাসীবিরোধী প্রস্তাবের পক্ষে ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) নাগরিকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে।ইতালীয় সংবিধানের ৭১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো নাগরিক প্রস্তাবের পক্ষে ৫০ হাজার বৈধ স্বাক্ষর সংগ্রহ করা গেলে তা আলোচনার জন্য সরাসরি সংসদে (Camera dei Deputati) পাঠানো যায়। সেই নিয়ম মেনেই গত ১৩ জুন ২০২৬ তারিখে এই পিটিশনটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইতালির পার্লামেন্টে জমা দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাটি শুধু অবৈধ অভিবাসীই নয়, বরং বৈধভাবে বসবাসরত লাখো প্রবাসীর মনেও চরম নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে।
পিটিশনের মূল বিষয়বস্তু ও পার্লামেন্টের বর্তমান পরিস্থিতি
ইতালির জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় মূলধারার গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তে
‘রেমিগ্রেশন’ বা জোরপূর্বক বিতাড়ন: এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো, যেসব অভিবাসী ইতালির সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাথে মিশে যেতে (Assimilate) পারেনি, তাদের জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানো।বৈধ প্রবাসীদের লক্ষ্যবস্তু করা: পিটিশনে দাবি করা হয়েছে—শুধু অবৈধ নয়, বরং যেসব বৈধ প্রবাসীর কারণে ইতালির সামাজিক কাঠামো বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে বলে তারা মনে করে, তাদেরও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশ থেকে বের করে দেওয়া উচিত।
সংসদে আলোচনার যেহেতু সংগঠনটি সফলভাবে ৫০,০০০ ইতালিয়ান নাগরিকের ভেরিফাইড স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে, তাই ইতালীয় আইন অনুযায়ী পার্লামেন্ট এই বিষয়টি নিয়ে অন্তত প্রাথমিক আলোচনা করতে বাধ্য। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে এই ধরনের মানবাধিকার বিরোধী বিল পাস হওয়া প্রায় অসম্ভব, তবুও দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় এটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হওয়াই প্রবাসীদের জন্য একটি বড় মানসিক ধাক্কা। এটি সমাজের গভীরে বর্ণবাদ ও জেনোফোবিয়া (বিদেশি-ভীতি) উসকে দিচ্ছে। ফলে নিয়মিত ট্যাক্স দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা বৈধ প্রবাসীরাও ভবিষ্যৎ অধিকার হরণের আশঙ্কায় ভুগছেন।
বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিক্রিয়া: আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান
এই খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ভয়ের সৃষ্টি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো ইতালির সংবিধান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) কঠোর মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কোনো বৈধ প্রবাসীকে এভাবে জোরপূর্বক দেশ থেকে বের করে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। তাই এই পিটিশন সংসদে উঠলেও, তা কখনো চূড়ান্ত আইনে পরিণত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মূলধারার বামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং শক্তিশালী মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই এই বর্ণবাদী প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছে।বর্তমান পরিস্থিতিতে ইতালিতে অবস্থানরত প্রবাসীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন কমিউনিটি নেতারা। নিজেদের অবস্থান
ইতালির স্থানীয় আইনকানুন পূর্বের চেয়ে আরও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
আর্থিক স্বচ্ছতা: নিয়মিত ও সঠিক সময়ে ট্যাক্স (কর) পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।উসকানি এড়িয়ে চলা: কোনো ধরনের উসকানিমূলক, বেআইনি বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডে জড়ানো থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ প্রবাসীরা যদি নিজেদের আইনি ও সামাজিক অবস্থান শক্ত রাখেন, তবে কোনো ডানপন্থী বা উগ্রবাদী সংগঠনের পক্ষে তাদের ক্ষতি করা সম্ভব হবে না।
ইতালি সংসদে রেমিগ্রেশন অ্যান্ড রিকনকোয়েস্ট’ আলোচনা অভিবাসীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক
আপডেট:

