
রুহুল আমিন, নিজস্ব প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে ট্রাক্টর আর পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষের পর জমিতে ইরি-বোরো ধানের চারা রোপনের জন্য দেশীয় পদ্ধতিতে মই টেনে মাটি সমান করছেন শ্রমিক মো. লাল ভুঁইয়া ও কৃষক মো. গিয়াস উদ্দিন।
বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারী) সকালে উপজেলার রাউতি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, লাঙ্গল-জোয়াল-মই ও গরু দিয়ে জমি চাষ করার চিরচেনা এই দৃশ্যটি।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১০ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য বীজতলা তৈরি করা হয়েছে ৪শ’ ৯৮ হেক্টর জমিতে। ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ জমিতে ধান রোপণের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ব্রি ৮১, ব্রি ৮৪, ব্রি ৮৮, ব্রি ৮৯, ব্রি ৯২ ব্রি ৯৬, ব্রি ১০০ জাতের ধানসহ অন্যান্য জাতের ধানের চারাও রোপণ করা হচ্ছে।
জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষি প্রধান দেশের মুল কারিগর হচ্ছেন কৃষক। কৃষকের চাষাবাদ করার জনপ্রিয় উপকরণ ছিল গরু-লাঙ্গল-জোয়াল ও মই। এক সময় দেখা যেত সেই কাক ডাকা ভোরে কৃষকরা গরু ও কাঁধে লাঙ্গল-জোয়াল-মই বয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়তো মাঠের জমিতে হালচাষ করার জন্য। সূর্যোদয়ের সাথে খাবারের জন্য তার স্ত্রী-সন্তানরা পান্তা ভাত, কাঁচা মরিচ ও আঁটিয়া কলা নিয়ে যেত মাঠে। কৃষক এসব খেয়ে মনের আনন্দে হাল চাষ করতো জমিতে। জমি চাষের ঐতিহ্যবাহী একটি চিরায়িত পদ্ধতি ছিলো গরুর কাঁধে জোয়াল বেধেঁ লাঙ্গল ও মই টেনে জমি চাষ। এটি ছিলো জমির উর্বরতা বৃদ্ধির মূল উপকরণ হিসেবে কৃষি পদ্ধতি। কিন্তু কালের পরিক্রমায় দিন দিন নতুন যন্ত্র আবিষ্কারের ফলে যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় সারাদেশ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে বাঙ্গালীর চিরচেনা সেই গরু-লাঙ্গল-জোয়াল ও মই দিয়ে জমি চাষের চিত্র। দেশের সব কিছুতেই এখন ডিজিটালের সু-বাতাস বইছে। মানুষ ডিজিটালাইজেশন সুবিধা গুলোও পাচ্ছে অনেক সহজেই। সেই অগ্রযাত্রা থেমে নেই কৃষি ভিত্তিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও।
বর্তমানে আধুনিকতার স্পর্শে ও বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিস্কারের ফলে কৃষকদের জীবনে এসেছে নানা পরিবর্তন। প্রকৃতির নানান অসংগতির কারণে ঝড়-বৃষ্টি- খড়ায় তড়িৎ সময়ে জমি চাষে কৃষকরা ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারসহ আধুনিক যন্ত্রপাতির উপর আগ্রহী হয়ে পড়েছেন। ফলে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে গরু-মহিষ-লাঙ্গল-জোয়াল ও মই দিয়ে জমিতে হাল চাষের পদ্ধতি।
উপজেলার রাউতি ইউনিয়নের রাউতি গ্রামের শ্রমিক মো. লাল ভুঁইয়া জানান, ছোটবেলা থেকে হাল চাষের কাজ করে আসছি। নিজের জমি হালচাষের পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে অন্যের জমিতেও হালচাষ করি। গরুর হাল আর তেমন একটা চলে না। মানুষ ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দিয়ে এখন জমি চাষ করে। গরুর হাল নিতে চায় না। ওই এলাকার কৃষক মো. গিয়াস উদ্দিন বলেন, একজোড়া গরুর দাম প্রায় দেড় থেকে পৌনে দু‘লাখ টাকা। এছাড়া বাজারে গরুর খাবারের মূল্য বেশি হওয়ায় গুনতে হয় কাঁচা টাকা। একজন হালিয়ার মজুরী ও গরুর খাবারের ব্যয়ভার হিসাব করে কেউ গরুর হাল রাখতে চায় না। একই গ্রামের সমাজ সেবক মো. আবদুস সাত্তার ভুঁইয়া বলেন, বর্তমান সরকারের অক্লান্ত চেষ্টায় কৃষিতে বিপ্লব ঘটেছে। তবে, আমাদের এই গ্রামীণ ঐতিহ্য গরু দিয়ে হালচাষ ও গরু পালন এগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে।
তাড়াইল উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুমন কুমার সাহা জানান, যান্ত্রিকতার ব্যবহারে গরুর হাল এবং মই টেনে কৃষি জমির মাটি সমান করার কাজটি এখন বিলুপ্তির পথে। গরুর হালের চাষে জমিতে ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি গভীর হয়। ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করলে ১১ থেকে ১২ ইঞ্চি গভীর হয়। চাষাবাদে জমির গভীরতা বৃদ্ধি পেলে মাটির উর্বরতা বাড়ে, ফসলও ভালো হয়। এজন্য কৃষক যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বেশি আগ্রহী।

