রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬

উৎসবের ২১শে ফেব্রুয়ারি বনাম উপেক্ষিত বাংলা ভাষা জাতীয় সংসদে বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত যাচ্ছে না

আপডেট:

বিশেষ প্রতিবেদন:১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি যে ভাষার জন্য এদেশের তরুণরা বুকে রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়েও সেই বাংলা ভাষা নিজ ভূমিতে কতটা মর্যাদা পাচ্ছে, তা নিয়ে আজ বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলে আমাদের আবেগ ও উচ্ছ্বাসের কমতি থাকে না। চারদিকে চলে আলোচনা সভা, মেলা আর সাংস্কৃতিক আয়োজন। কিন্তু উৎসবের এই জাঁকজমকপূর্ণ আবরণের আড়ালে আমাদের দৈনন্দিন ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মাতৃভাষা বাংলা চরমভাবে অবহেলিত ও উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
​মহান জাতীয় সংসদে ভাষার সংকট: জনপ্রতিনিধিদের দায় কতটুকু?গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। অথচ দেশের আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ স্থান—মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রায়শই মাননীয় সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশকে ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতে দেখা যায়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রনেতারা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজেদের মাতৃভাষাকে গর্বের সাথে তুলে ধরেন। অথচ আমাদের সংসদে যেখানে মাননীয় স্পিকার থেকে শুরু করে সকলেই বাঙালি, সেখানে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে কেন ইংরেজি ভাষার আশ্রয় নিতে হবে? এই প্রবণতা কি ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি এক ধরনের অবমাননা নয়?সংসদে যখন বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তখন প্রশ্ন জাগে—মাননীয় সংসদ সদস্য ও নীতি-নির্ধারকেরা কি আসলেই ভাষা শহীদদের মর্যাদা রক্ষা করে চলছেন, নাকি এটি কেবলই ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতা?
​সরকারি টেন্ডার ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ইংরেজির দাপট
​বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ থাকা সত্ত্বেও দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ নথি, বিশেষ করে দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়াগুলো এখনও ইংরেজিতে সম্পন্ন করা হয়। দেশের সাধারণ ব্যবসায়ী, ঠিকাদার কিংবা আমজনতা যেন সহজে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বুঝতে না পারেন, তার জন্যই কি এই ঔপনিবেশিক ভাষার দেওয়াল তুলে রাখা হয়েছে? স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন আমরা আমাদের সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কাজ বাংলায় রূপান্তর করতে পারলাম না, তা এক বড় ব্যর্থতা।‘ইংরেজি জানলেই পন্ডিত’—মানসিকতার অবক্ষয়, বর্তমান বিশ্বে এমন কোনো আত্মমর্যাদাশীল দেশ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যারা নিজেদের ভাষাকে এভাবে পেছনে ঠেলে দেয়। জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, চীন বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলো তাদের নিজেদের ভাষায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও রাষ্ট্র পরিচালনা করে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
​দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজে এখনও এক শ্রেণির মানুষের মাঝে এমন এক হীনম্মন্যতা কাজ করে যে—ইংরেজিতে কথা বলতে পারলে নিজেকে অনেক বেশি জ্ঞানী বা আধুনিক ভাবা যায়। এই মানসিকতাই আমাদের নতুন প্রজন্মকে শিকড় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
পরিশেষে বলতে হচ্ছে, মাতৃভাষাকে কেবল আবেগ আর উৎসবের মধ্যে বন্দী না রেখে, একে কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা, আদালত, প্রশাসন এবং জাতীয় সংসদের একমাত্র প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা না হলে ২১শে ফেব্রুয়ারির এই ‘উচ্ছ্বাস’ কেবলই এক প্রদর্শনীতে পরিণত হবে, আর অন্তরালে কাঁদবে ভাষা শহীদদের রক্তে ভেজা বাংলা ভাষা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত