শনিবার, মে ২৩, ২০২৬

রামিসার রক্তে ভেজা প্রশ্ন এবং আমাদের সামগ্রিক দায়

আপডেট:

রামিসা আর আমাদের মাঝে নেই। বিকৃত লালসা আর নরপশুদের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে সে বিদায় নিয়েছে এই স্বাধীন দেশ থেকে। কিন্তু যাওয়ার আগে সে যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, তা আমাদের বিবেককে, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এবং আমাদের গণমাধ্যমকে এক চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রামিসার কাল্পনিক বা আত্মিক সেই আকুতি—”কয়দিন আপনাদের সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলগুলো আলোচনা করবে?”—আসলে কোনো অবান্তর প্রশ্ন নয়, বরং আমাদের ক্ষণস্থায়ী আবেগের ওপর এক তীব্র চাবুক।​আমাদের সমাজে কোনো নির্মম হত্যাকাণ্ড বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে সংবাদমাধ্যমে কয়েকদিন তা নিয়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। টকশোতে বিজ্ঞ আলোচকরা আসেন, ভারী ভারী শব্দে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশ্লেষণ করেন। কিন্তু কদিন পরই নতুন কোনো ঘটনার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় পুরোনো রামিসাদের রক্ত। এই বৃত্তাকার উদাসীনতার কথাই রামিসা মনে করিয়ে দিয়েছে।
​সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, রামিসার বাবা-মায়ের আর্তনাদ আজ এতটাই ভারী যে, তা ওপারের সুখময় জীবনকেও বিষময় করে তুলছে। একজন সন্তানহারা বাবার আত্মচিৎকার যখন এই রাষ্ট্র, আদালত আর সংবাদমাধ্যমের ওপর সব আস্থা হারিয়ে স্ত্রীকে ডেকে বলতে বাধ্য করে—”তুমিও চলে এসো, এই রাষ্ট্র কেউ কিচ্ছু করতে পারবে না”—তখন বুঝতে হবে সমাজের পচন কতটা গভীরে ধরেছে। নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে না পারা এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুত নিশ্চিত করতে না পারার এই দায় রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে যখন একের পর এক ‘রামিসা’ এভাবে হারিয়ে যায় এবং বিচারহীনতার ভয়ে পরিবারগুলো চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয়, তখন সেই স্বাধীনতা ও সভ্যতার ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।আমরা আর কতকাল শুধু সম্পাদকীয় লিখে ক্ষোভ প্রকাশ করব? আর কতকাল টকশোতে বসে তাত্ত্বিক কথা বলব?আমাদের এখনই যা করা প্রয়োজন:
​দ্রুততম বিচার নিশ্চিতকরণ: নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলিয়ে না রেখে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন করতে হবে।গণমাধ্যমের শুধু ঘটনার পরপরই নয়, বরং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমকে সেই মামলার গতিপ্রকৃতির ওপর নিয়মিত নজরদারি ও চাপ বজায় রাখতে হবে।​আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা: তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার রুখতে হবে।রামিসার বাবার সেই আত্মচিৎকার যেন সত্যে পরিণত না হয়। রাষ্ট্র, আদালত এবং গণমাধ্যমকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা ঠুঁটো জগন্নাথ নয়। রামিসার পরিবারসহ আর কোনো পরিবার যেন এই চরম বিচারহীনতার হতাশায় নিমজ্জিত না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। অপরাধীদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, যা দেখে আর কোনো নরপশু এই মাটিতে বুক ফুলিয়ে হাঁটার সাহস না পায়।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত