বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩০, ২০২৬

অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ফেনীর উন্নয়নবঞ্চনা ও অবহেলার বৃত্ত ভাঙবে কে?

আপডেট:

প্রধান সম্পাদক
আনোয়ার মোরশেদ মজুমদার (বিটু)

​ভৌগোলিক অবস্থান, সমৃদ্ধ আর্থসামাজিক চালচিত্র এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি—সব সূচকে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও ‘ফেনী’ কি এক অবহেলিত জনপদের নাম? স্থানীয় সচেতন সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে আজ এই প্রশ্নটিই বেশ জোরালোভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লাইফলাইন ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে’র কী-পয়েন্টে অবস্থিত এবং রেমিট্যান্স ও রাজস্ব আয়ে শীর্ষবিন্দুতে থাকা সত্ত্বেও ফেনীর এই দীর্ঘমেয়াদি বঞ্চনা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদেরও ভাবিয়ে তুলছে।দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা সত্ত্বেও কেন চরম অবহেলার শিকার এই জেলা? ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালে যখন নারায়ণগঞ্জকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করা হয়, তখনও রাজস্ব আয়ে ফেনী পৌরসভা অনেক বিষয়ে এগিয়ে ছিল। সম্প্রতি নতুন সিটি কর্পোরেশন হিসেবে কক্সবাজারের নাম যুক্ত হলেও ২০০০ সাল থেকে চলে আসা ফেনীবাসীর ন্যায্য দাবিটি এবারও বাস্তবায়িত হয়নি। শুধু সিটি কর্পোরেশনই নয়; একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের মতো মৌলিক ও দীর্ঘদিনের দাবিগুলো আজও লালফিতার দৌরাত্ম্যে বন্দি।এই স্থবিরতা ও বঞ্চনার নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় চোখ মেলতে হয়। অতীতে একাধিক সরকারের আমলে ফেনী থেকে মন্ত্রী কিংবা জাতীয় নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুপস্থিতিকে অনেকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখে থাকেন। যদিও সংসদ সদস্য অধ্যাপক ভিপি জয়নাল, মহিলা সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু কিংবা রফিকুল আলম মজনুর মতো নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদ ও রাজপথে ফেনীর বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেছেন। তবে বিএনপির মতো সরকার গঠন করলেও, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে শীর্ষ পদে ফেনীর জেলার কোন রাজনৈতিক নেতা নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ফেনীর নীতি-নির্ধারণী প্রভাবশালী নেতৃত্বের অভাবের কারণে সেই দাবিগুলো বাস্তবায়নের রূপ পায়নি।​তবে কেবল জাতীয় রাজনীতির সমীকরণকে দায়ী করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। ফেনীর উন্নয়ন অগ্রগতি না হওয়ার মূল ব্যবচ্ছেদ করলে আরও একটি নির্মম সত্য বেরিয়ে আসে—তা হলো স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের চরম আন্তরিকতার অভাব এবং সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি। ক্ষমতার পালাবদল কিংবা সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব বদলালেও স্থানীয় নেতৃত্ব ফেনীর সার্বিক টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে এক টেবিলে বসতে ব্যর্থহয়েছেন।
​উত্তরণের উপায় কী?
​এই বঞ্চনার বৃত্ত থেকে ফেনীকে বের করে আনতে হলে অবিলম্বে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
​১. দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে রাজনৈতিক ঐক্য: ফেনীর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দল-মত নির্বিশেষে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে ফেনীর প্রতিনিধিত্বকারী নেতাদের জোরালো ও সমন্বিত লবিং নিশ্চিত করতে হবে।
২. প্রশাসনের আন্তরিকতা ও জবাবদিহিতা: স্থানীয় প্রশাসনকে কেবল রুটিন কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ফেনীর সিটি কর্পোরেশন, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাঠানোর জন্য তৎপর হতে হবে।
৩. নাগরিক সমাজের সোচ্চার ভূমিকা: ফেনীর ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও সচেতন নাগরিক সমাজকে একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দাবিসমূহ বাস্তবায়নে নিয়মিত সোচ্চার থাকতে হবে।
৪. অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরা: ফেনীর রাজস্ব অবদান ও ভৌগোলিক গুরুত্বের যৌক্তিক তথ্য-উপাত্ত সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
​ফেনী কোনো সাধারণ জেলা নয়; দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির এক অন্যতম স্তম্ভ। কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্থানীয় নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাবে একটি সম্ভাবনাময় জনপদ এভাবে পিছিয়ে থাকতে পারে না। ফেনীবাসীর প্রত্যাশা—অবিলম্বে ফেনীকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করা সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের দাবি মেনে নিয়ে বৈষম্যের সমাপ্তি টানা হোক।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত