টিপু মিঞা
প্যারিস
”ফ্রান্স আসো সমস্যা নাই, কিন্তু কাগজ দেবো না!”—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দেয়ালে দেয়ালে ঘুরে বেড়ানো এই একটা ট্রল কিংবা মিম হয়তো আমাদের ক্ষণিকের বিনোদন দেয়, কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাস আর বিনিদ্র রজনীর গল্পটা চেনা যায় কেবল বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ালে। ইউরোপের চোখধাঁধানো আলোর নিচে যে কতটা ঘন অন্ধকার জমা হয়ে থাকে, তা বাইরের অবাস্তব স্বপ্নালু চোখ দিয়ে দেখা অসম্ভব।বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সে বা সামগ্রিকভাবে ইউরোপে ইমিগ্রেশন সংকট যে আরও তীব্র ও জটিল হচ্ছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই কঠিন বাস্তবতাকে তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা জরুরি:
১. কঠোরতর আইন ও রাজনৈতিক সমীকরণ
ফ্রান্সসহ পুরো ইউরোপ জুড়েই এখন ইমিগ্রেশন আইন দিন দিন কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে। রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সমীকরণের কারণে অনিয়মিত অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার পথগুলো প্রায় সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে, আগে যেখানে কয়েক বছর কঠোর পরিশ্রম বা আইনি প্রক্রিয়ার পর একটা আশা থাকত, এখন সেই আশার আলোটুকুও অনিশ্চয়তায় ঢাকা। বছরের পর বছর ঝুলে থাকা ‘রেসিডেন্স পারমিট’-এর ফাইলগুলো এখন প্রবাসীদের জীবনের সেরা সময়গুলোকে গিলে খাচ্ছে।
২. অর্থনৈতিক শ্রম ও মানবিক মর্যাদা
কাগজহীন জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো শ্রমের অবমূল্যায়ন। বৈধ নথিপত্র না থাকায় একজন তরুণ বাধ্য হয়ে ‘ব্ল্যাক জব’ বা অনানুষ্ঠানিক খাতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেখানে নেই কোনো কাজের নিরাপত্তা, নেই ন্যায্য মজুরি, আর মানবিক মর্যাদা তো সুদূরপরাহত। তীব্র শীত বা প্রচণ্ড গরমে যে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়, তার বিনিময়ে যা জোটে, তা দিয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দায়, দেশের রেমিট্যান্সের চাকা সচল রাখা তো পরের কথা।
৩. মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ও ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ সিন্ড্রোম
আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে একটা হাসিমুখের ছবির পেছনের গল্পটা বড় অদ্ভুত। সামাজিক মর্যাদা আর পরিবারের প্রত্যাশার চাপে প্রবাসীরা নিজেদের কষ্টগুলো বুকে চেপে রাখেন। দেশে থাকা প্রিয়জনেরা ভাবেন ছেলে ইউরোপের স্বর্গে আছে, অথচ সেই ছেলেটি হয়তো এক রুমে গাদাগাদি করে থাকার মানসিক যন্ত্রণা আর প্রতিনিয়ত ডিটেনশন বা দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। এই একাকীত্ব ও মানসিক চাপ অনেক সময় একজন মানুষকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়।দালালের চটকদার বিজ্ঞাপন কিংবা মিম দেখে ফ্রান্সে আসার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখন আর নেই। আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করতে হবে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে পা বাড়ানোর চেয়ে, নিজেকে দক্ষ করে, সঠিক ও আইনি পথ অবলম্বন করে ইউরোপে আসার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।বাস্তবতা হলো—ইউরোপ এখন আর শুধু স্বপ্নের দেশ নয়, এটি একটি কঠিন যুদ্ধক্ষেত্র। আর প্রস্তুতি ছাড়া যুদ্ধে নামলে পরাজয় অনিবার্য।
ফ্রান্সে ‘চকচকে’ মরীচিকা বনাম নির্মম বাস্তবতা প্রয়োজনীয় আত্মোপলব্ধি
আপডেট:

