মাদারীপুরের বাসিন্দা সাইদুর স্থল ও সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে গ্রিসে গেছেন এক বছর আগে। এখন সে দেশেই আছেন। প্রথমে ওমান, পরে সেখান থেকে থেকে ইরান, তুরস্ক হয়ে স্থলপথে গ্রিসে পৌঁছেন তিনিমাদারীপুরের বাসিন্দা সাইদুর স্থল ও সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে গ্রিসে গেছেন এক বছর আগে। এখন সে দেশেই আছেন। প্রথমে ওমান, পরে সেখান থেকে থেকে ইরান, তুরস্ক হয়ে স্থলপথে গ্রিসে পৌঁছেন তিনি। ওমান থেকে ইরানে যাওয়ার জন্য ছোট ট্রলারে ওঠেন। ৪ ঘণ্টায় ইরানে পৌঁছার কথা থাকলেও পাঁচদিন পাঁচ রাত সাগরের মাঝে ভেসে থাকতে হয়েছে তাকে। ইরানের বন্দর আব্বাসে যাওয়ার পর মোটরসাইকেলে ও হেঁটে, জঙ্গলে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করে তুরস্কে পৌঁছেন তিনি। তুরস্ক থেকে গ্রিসে প্রবেশের সময় ঝুঁকিপূর্ণ একটি সীমান্ত পার হতে হয় তাকে। তিনদিন ওই সীমান্তের কাছাকাছি জঙ্গলে থেকে সুযোগ বুঝে গ্রিসে ঢুকে পড়েন। দীর্ঘ এ যাত্রাপথে ১৭-১৮ দিন শুধু পানি পান করেছেন। কখনো এক বোতল পানি চারজন ও একটা শুকনা রুটি তিনজনে ভাগ করে খেয়েছেন। দালালরা শুধু তুরস্ক থেকে গ্রিসে ঢোকার জন্য সাড়ে চার লাখ টাকা নিয়েছেন সাইদুরের কাছ থেকে। এ যাত্রায় বাংলাদেশ থেকে গ্রিসে পৌঁছতে তার খরচ হয়েছে ২০ লাখ টাকার বেশি।শুধু সাইদুর নয়, কাজের সন্ধানে প্রতি বছরই অবৈধ পথে ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করছেন হাজার হাজার বাংলাদেশী। এ কাজে জড়িত মানব পাচার চক্রটি পশ্চিম বলকান অঞ্চল ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। যেখানে যুক্ত আছে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারীরা। অনেকে গন্তব্যে পৌঁছতে পারলেও বেশির ভাগ অভিবাসনপ্রত্যাশীর ভাগ্যে নেমে আসে নির্মম পরিণতি। পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে বৈধ পথে যে পরিমাণ বাংলাদেশী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন প্রায় সমপরিমাণ বাংলাদেশী অবৈধ পথে দালালের মাধ্যমে ইউরোপে গেছেন।আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে অবৈধ পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ৯৭ হাজার ৮৩২ বাংলাদেশী। এর মধ্যে স্থল ও সমুদ্রপথে গেছেন ৫৮ হাজার ২৯ জন। আর পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে গেছেন ৩৯ হাজার ৮০৩ জন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, একই সময়ে কর্মী ভিসায় ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে বৈধ পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ৯৮ হাজার ৮৬৬ বাংলাদেশী।অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত জীবন ও আর্থিক সচ্ছলতার জন্য ইউরোপে যাওয়া বাংলাদেশীদের প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি। বর্তমানে একটি ট্রেন্ড চলছে ইউরোপে পাড়ি জমানোর। এছাড়া অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনার ব্যর্থতাও একটি বড় কারণ হিসেবে মনে করেন তারা।বিএমইটির তথ্যমতে, বৈধ পথে ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে গেছেন ২০ হাজার ৮৩৯ বাংলাদেশী, যা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৩ সালেই সর্বোচ্চসংখ্যক ৪৬ হাজার ২৪২ বাংলাদেশী ইউরোপে যান। ২০২২ সালে গেছেন ২৩ হাজার ৮০৬ জন, ২০২১ সালে ৬ হাজার ২৩৯ ও ২০২০ সালে ১ হাজার ৭৪০ জন কর্মসংস্থানের জন্য পাড়ি জমান ইউরোপে।সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈধ পথে যাওয়ার পথ সংকীর্ণ হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্থল ও সমুদ্রপথে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। স্থলপথে দালালের মাধ্যমে সাড়ে ২২ লাখ টাকা খরচ করে ইতালি পৌঁছেছেন হবিগঞ্জের সুমন মিয়া। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে প্রথমে দুবাই আসি। দুবাই থেকে লিবিয়া। সেখানে চার মাস থাকার পর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছি ছোট নৌকায়, তারপর ইতালি পৌঁছি। এত বড় ঢেউ ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। অনেক কষ্ট হয়েছে। দিনের পর দিন না খেয়ে, না ঘুমিয়ে স্বপ্নপূরণে ইউরোপে আসেন অনেকে। ইউরোপের নেশা এক ভয়ংকর নেশা। ঝুঁকি নিয়ে এভাবে কাউকে না আসার জন্য অনুরোধ করব।’
তিনি বলেন, ‘গ্রিস থেকে আলবেনিয়া হয়েও অনেকে ইতালি যায়। অনেকে ইরান হয়ে তুরস্কে প্রবেশ করছে। স্থলপথে যারা আসে তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে হয়। প্রথমে দালালের সঙ্গে চুক্তি করে ১১ লাখ টাকায় লিবিয়া আসি। সেখান থেকে ইতালি যেতে সাড়ে ২২ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে।আইওএম ‘বাংলাদেশ মাইগ্রেশন স্ন্যাপসর্ট রিপোর্ট’-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গেছেন ১৫ হাজার ৩০৪ বাংলাদেশী। ২০২৩ সালে গেছেন ১৩ হাজার ৭৭৩ জন, ২০২২ সালে ১৬ হাজার ৪৮৭ এবং ২০২১ ও ২০২০ সালে যথাক্রমে ৭ হাজার ৯৫৫ ও ৪ হাজার ৫১০ জন। পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে এসব দেশে ২০২৪ সালে গেছেন ৩ হাজার ৪২৭ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৮৬৩ জন, ২০২২ সালে ১০ হাজার ৪০, ২০২১ সালে ৭ হাজার ৬২৯ ও ২০২০ সালে গেছেন ৮ হাজার ৮৪৪ বাংলাদেশী।
আইওএমের প্রতিবেদন বলছে, স্থল ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশীদের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে ইউরোপের পাঁচটি দেশ ইতালি, গ্রিস, মাল্টা, সাইপ্রাস ও স্পেন। এর মধ্যে ইতালি শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া পশ্চিম বলকান ও পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন স্লোভেনিয়া, আলবেনিয়া, বসনিয়া, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া, মন্টেনিগ্রো ও কসোভোকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছেন বাংলাদেশীরা। ২০২৪ সালে এসব দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করেছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাংলাদেশী অভিবাসনপ্রত্যাশী। ২০২৩ সালে সংখ্যাটি ছিল ৯ হাজার ৮৬৩। অনেকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে এসব দেশ থেকে আর বের হতে পারেননি।অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরো বেশি হবে। এ প্রবণতা সামনে আরো বাড়বে। ইউরোপের দেশগুলো অনেক সময় অভিবাসন আইন শিথিল করে অথবা বৈচিত্র্যের জন্য অ্যাসাইলামের সুযোগ দেয়। মানুষের মধ্যে একটা ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে, যেভাবেই পারি যাই, একটা পর্যায়ে সেখানে থেকে যাওয়া যাবে। দেশে ফেরত আসতে হবে, এ চিন্তা তাদের থাকে না। আগের উদাহরণগুলো দেখেই যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। যেহেতু এখানে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত, সেটি বাংলাদেশ একা মোকাবেলা করতে পারবে না। আর আন্তর্জাতিকভাবে যেসব নেটওয়ার্ক কাজ করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে কোনো দেশই খুব বেশি সফল হয়নি। দেশে-বিদেশে অপরাধী চক্রকে আইনের আওতায় আনার ব্যর্থতাও একটি বড় কারণ। এ কারণে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
সুত্র : বনিকবার্তা

