মোঃ বদরুজ্জামান বাপ্পি
২০০৪-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে আমরা ৬০ জন তরুণ-তরুণী শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। ২০১২ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করে আজ আমাদের ব্যাচের অনেকে দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন, অনেকেই বিসিএস ক্যাডার কিংবা ব্যাংকার হিসেবে দেশ ও সমাজসেবায় নিবেদিত। কিন্তু এই ৬০ জনের ভিড়ে দুজন ব্যতিক্রমী মানুষ আছেন, যাদের কথা আলাদা করে বলা প্রয়োজন—বিউটি পাল এবং মাসুদুল ইসলাম রানা।উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি, প্রথম শ্রেণি এবং মেধা থাকা সত্ত্বেও এই দুজন বড় শহরের আলো-ঝলমলে পরিবেশ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসিকক্ষ বেছে নেননি। তারা বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে অবহেলিত, অবজ্ঞাত ও প্রান্তিক স্তর—প্রাথমিক শিক্ষা। বিউটি ও রানা স্বপ্নবাজ। তাই তারা সিলেট শহরের আভিজাত্য আর ক্যাম্পাসের জাঁকজমকপূর্ণ লাইব্রেরির সুযোগ ছেড়ে চলে গেছেন প্রত্যন্ত গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। যেখানে শিক্ষকদের বই কেনার জন্য সামান্য ২০০ টাকার প্রণোদনাও নেই, নেই ৫০ টাকার ইন্টারনেট ভাতা। তবুও তারা নিজেদের গাঁটের টাকা খরচ করে গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর হয়েছেন।কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের হাওরাঞ্চলের পাওন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন রানা। হাওরের আফাল, বিশাল ঢেউ আর নৌকাডুবির শঙ্কা পেরিয়ে যেখানে পৌঁছাতে হয়, সেই বিচ্ছিন্ন জনপদে রানা আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। আবার অন্যদিকে বিউটি পাল কাজ করছেন আর এক কঠিন সামাজিক বাস্তবতার বিপরীতে।আজকের গ্রামগুলো যেন এক বিচিত্র বৈপরিত্যে ভরা। প্রবাসীদের টাকার গরম, দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টার লোডশেডিং, মানুষের ভেতরে অন্যের প্রতি অকল্যাণকামিতা আর ধর্মকে আধ্যাত্মিকতার চেয়ে লৌকিকতায় রূপ দেওয়ার এক মেকি সামাজিক পরিবেশ। সেই গ্রামে যেখানে শিক্ষকরা সম্মান হারিয়ে স্রেফ ‘মাস্টর’ উপাধিতে আটকে গেছেন, যেখানে জরাজীর্ণ ক্লাসরুমের রূপ ফিটফাট হলেও ভেতরে ছালবাকলহীন অবস্থা—সেখানেই লড়াই করছেন রানা আর বিউটিরা।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যারা আর্টসেল, শিরোনামহীন বা মাইলসের কনসার্টে মেতে উঠত, বৈশাখে ‘নোঙর’-এর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচত, তাদের সেই সাদাকালো রঙিন স্মৃতি আজ চাপা পড়েছে গ্রামের ধূসর বাস্তবতায়। কিন্তু সমাজের চোখে বিউটি পালের অপরাধ অনেক! তার অপরাধ—তিনি নীল রঙের শাড়ি পরেছেন, তার অপরাধ—আমাদের মলিন শিক্ষাব্যবস্থায় তিনি সিল্কি চুল বাতাসে উড়িয়েছেন। তাদের অপরাধ—গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের বাচ্চাদের তারা ‘টুইংকেল টুইংকেল লিটিল স্টার’ শেখান। কারণ, সমাজ ধরে নিয়েছে ইংরেজি শিখবে শহরের ‘ভদ্রলোকের’ সন্তানেরা, আর গ্রামের বাচ্চারা থাকবে দুর্বল। তারা ফেল করতে করতে বড় হবে, বিদেশের মাটিতে আদম মেধা হিসেবে রপ্তানি হবে, দেশের জিডিপি বাড়াবে কিন্তু তাদের পরিবারের ‘হ্যাপিয়ার ইনডেক্স’ শূন্যতেই থেকে যাবে।
বিউটি পাল আর মাসুদুল ইসলাম রানার বড় অপরাধ—তারা গ্রামের শিশুদের বড় স্বপ্ন দেখায়। সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলে ‘এসকেপিজম’। তারা চলতি সামাজিক ব্যবস্থার নির্মম সত্যকে মেনে না নিয়ে সিস্টেমকে বদলাতে চায়। স্নাতকোত্তরে পড়া মিশেল ফুকোর ‘ম্যাডনেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’ বইটির মর্মার্থ তারা জীবনের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাই তো হাজারো সামাজিক চাপ ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতার মধ্যেও বিউটি পালের মতো শিক্ষকেরা ক্লাসরুমে নেচে-গেয়ে শিশুদের শেখানোর সাহস পান।আমি অধম নিজেও একজন শিক্ষক। তেরো বছরের শিক্ষকতা জীবনে রুটিনের কোনো ক্লাস কোনোদিন মিস করিনি। তবে মনের ভেতর একটু পাগলামি আছে; প্রচলিত কাঠামোর (Structuralism) বিপরীতে আমার প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে আজ এলোমেলো চুল রেখেছি। কারণ, আমরাও বদলাতে চাই এই বিচিত্র আর বৈষম্যপূর্ণ বাংলাদেশকে।গ্রামের অন্ধকার দূর করা বিউটি পাল, মাসুদুল ইসলাম রানা এবং তাদের মতো শত শত স্বপ্নবাজ শিক্ষকদের বিনম্র স্যালুট। আপনারা হার মানবেন না; আপনাদের এই পাগলামিই হয়তো একদিন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্ধকার ঘুচিয়ে ভোরের নতুন সূর্য নিয়ে আসবে।

