বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশটির তেল উৎপাদনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এতে ইরান পুরোপুরি অর্থনৈতিকভাবে ধসে পড়বে, এমন দাবি এখনই বলার সময় আসেনি। কয়েক সপ্তাহের বোমা হামলা ও পাল্টা হামলার পর এখন কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অচলাবস্থা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়ার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে পাল্টা অবরোধ আরোপ করে। এর লক্ষ্য তেহরানকে শান্তি আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করা। তবে স্বল্পমেয়াদে এই কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে। তেহরানের শহীদ বেহেশতি ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক সাঈদ লাইলাজ এএফপি’কে বলেন, অবরোধ যদি দুই-তিন মাসের বেশি স্থায়ী হয়, তখন এটি ইরানের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলে পারস্য উপসাগরের দক্ষিণের দেশগুলোর ক্ষতি অবশ্যই আরও বেশি হবে। তবে ইরানের জন্য অপেক্ষা করার সময়ও সীমিত।
গ্লোবাল রিস্ক ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিশ্লেষক আর্নে লোহমান রাসমুসেন বলেন, ধারণা করা হচ্ছিল প্রায় এক মাসের মধ্যে ইরানের তেল সংরক্ষণের জায়গা শেষ হয়ে যাবে। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের আংশিক উৎপাদন বন্ধ করতে হতে পারে।
অর্থনৈতিকভাবে ধসে পড়ছে?
মঙ্গলবার ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ১২ই এপ্রিল মার্কিন নৌবাহিনীর আরোপিত অবরোধের ফলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে ধসে পড়ছে এবং দেশটি টাকার জন্য হাহাকার করছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, এই অবরোধের কারণে ইরানের প্রধান রপ্তানি টার্মিনাল খার্গ আইল্যান্ডে তেলের সংরক্ষণ ফুরিয়ে যাবে এবং নাজুক তেলক্ষেত্রগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।মিডল ইস্ট ইকোনমিক সার্ভের (এমইইএস) ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জেমি ইনগ্রাম এএফপি’কে বলেন, ইরানের সংরক্ষণ ক্ষমতা শেষ হওয়ার সময়সীমা ‘দিন নয়, বরং কয়েক সপ্তাহে’ পরিমাপ করা হবে। তিনি আরও বলেন, সংরক্ষণ সংকট প্রকট হওয়ার আগেই ইরান সম্ভবত উৎপাদন কিছুটা কমিয়ে দেবে। ‘কেপলার’ নামের জ্বালানি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেয়ার করা তেল বিশেষজ্ঞ হোমায়ুন ফালাকশাহির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানের তেল উৎপাদন কমে গেছে। মার্চে উৎপাদন দৈনিক প্রায় ২ লাখ ব্যারেল কমে ৩.৬৮ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়ায়। এপ্রিল মাসে তা আরও ৪ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল কমে প্রায় ৩.৪৩ মিলিয়ন ব্যারেলে নামতে পারে। তিনি বলেন, এটি চলমান সংঘাতের কারণে রপ্তানি ব্যাহত হওয়া এবং পরিশোধন সীমাবদ্ধতার সামগ্রিক প্রভাবকে প্রতিফলিত করছে।তবে তেহরানের লাইলাজ বলেন, মানসিক প্রভাব ছাড়া অবরোধের বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো সীমিত। ইনগ্রাম বলেন, খার্গ আইল্যান্ড ইরানের জন্য বড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এটি রপ্তানির আগে শেষ সংরক্ষণ কেন্দ্র। ইরান চাইলে তেল সরাসরি সেখানে না পাঠিয়ে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিতে পারে।পারস্পরিক ক্ষতির ভারসাম্য এমইইএস’র এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল রপ্তানির ওপর ইরানের নির্ভরতা বেড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় অর্থনীতির অন্যান্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আগের নিষেধাজ্ঞার সময়ও ইরান বড় ধরনের তেল রাজস্ব হ্রাস সহ্য করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এই ক্ষেত্রে তাদের সহনশীলতাকে খাটো করে দেখা উচিত নয়।ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রাথমিক দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার সময় ট্রাম্প জানান, তিনি শান্তি আলোচনার জন্য আরও সময় দিতে তা বজায় রাখবেন। ইরান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানালেও ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেনি। একইসঙ্গে জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন অবরোধ বহাল থাকলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা হবে না। ইনগ্রাম বলেন, এ ধরনের অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে অনেক সময় লাগবে। বরং এতে চীন ইরানের ওপর আলোচনায় বসার জন্য বেশি চাপ দিতে পারে।ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, যুদ্ধের আগেই ইরানের অর্থনীতি দুর্বল ছিল। যুদ্ধের সময় আরও চাপের মুখে পড়ে। আর এখন নিষেধাজ্ঞা, জাহাজ জব্দ ও সম্ভাব্য হামলার সম্মিলিত প্রভাব মোকাবিলা করছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের নেতৃত্ব অতীতে চাপ সহ্য করার উচ্চ ক্ষমতা দেখিয়েছে- যদিও এতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ে। একইসঙ্গে তারা হয়তো মনে করে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত করার তাদের পদক্ষেপ এক ধরনের ‘পারস্পরিক ক্ষতির ভারসাম্য’ তৈরি করছে।
ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম
আপডেট:

