পুর্ব ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম ইউরোপ শ্রম ঘাটতি বাংলাদেশের বেকার তরুণ তরুণী জন্য আর্শীবাদ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক প্রচলিত শ্রমবাজারের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ভাষা শিক্ষার বিস্তার এবং কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের মাধ্যমে পাঁচ বছরে দেশে ও বিদেশে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি বছর ১৫ লাখ এবং আগামী বছর ২০ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু, নতুন নতুন দেশের সঙ্গে শ্রমচুক্তি, প্রয়োজনে লবিস্ট নিয়োগ এবং অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর আমাদের সময়কে বলেন, বর্তমানে বছরে গড়ে ১০ থেকে ১১ লাখ কর্মী বিদেশে গেলেও সরকারের লক্ষ্য প্রথম বছরে ১৫ লাখ এবং দ্বিতীয় বছরে ২০ লাখে উন্নীত করা। একই সঙ্গে ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও নতুন সম্ভাবনাময় বাজারে দক্ষ কর্মী পাঠাতে ট্যালেন্ট পার্টনারশিপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের সনদ নিশ্চিত করার কাজ চলছে।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিল, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তির উদ্যোগ, উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফর, বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনে স্থানীয় লবিস্ট ফার্ম নিয়োগের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জাপান, থাইল্যান্ড ও মরিশাসসহ নতুন সম্ভাবনাময় বাজারেও কর্মী পাঠানোর প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের পর দেশটির শ্রমবাজার আবার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পথে, যা সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী পাঁচ বছরে দেশে ও বিদেশে মোট এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রথম বছরে ১৫ লাখ এবং দ্বিতীয় বছরে ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ভাষা প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, অভিবাসন ব্যয় কমানো, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা এবং নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তবে সেটি করতে হলে যে মানদণ্ড ধরকার তা কি করতে পারবে। সরকার বলছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরেই নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে গেছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৮ সালে বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৬ সালে পুনরায় চালু হলেও ২০১৮ সালে আবারও বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে মালয়েশিয়া। ২০২২ সালের আগস্টে নতুন করে কর্মী যাওয়া শুরু হলেও ২০২৪ সালের ১ জুন আবার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা ও বিভিন্ন শর্ত নিয়ে সমঝোতার পর অবশেষে পুনরায় শ্রমবাজার চালুর সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে।এদিকে ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা ৭ হাজার ৮৭৩ জন কর্মীকে পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারি সংস্থা বোয়েসেলকে। ইতোমধ্যে প্রায় তিন হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে সক্ষম হয়েছেন। বাকি কর্মীদেরও দ্রুত পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।সরকার পাঁচ বছরে দেশে ও বিদেশে মোট এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রথম বছরে ১৫ লাখ এবং দ্বিতীয় বছরে ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি, বিদ্যমান বাজার সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনশক্তি তৈরি, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি মূলত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত ও মালয়েশিয়াকেন্দ্রিক ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জার্মানি, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ডসহ ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দক্ষ কর্মীর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সরকার এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে কাজে লাগাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন শ্রমচুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিয়েছে।সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় কারিগরি ও ভাষা প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, টিটিসিগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য দক্ষতার সনদ প্রদান করা হবে। বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের উচ্চ আয়ের বাজারে প্রবেশের জন্য ভাষাজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

