শনিবার, মে ২৩, ২০২৬

মেস্ত্রের ‘ঢাকাটাউন’ ও ভোটের রাজনীতি—সংস্কৃতির সংঘাত নাকি ইতালির নতুন রূপান্তর?

আপডেট:

ইতালির ভেনিস সংলগ্ন মেস্ত্রে (Mestre) শহরের আসন্ন মিউনিসিপালিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে যে অভূতপূর্ব আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তাকে কেবল একটি সাধারণ নির্বাচন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শীর্ষ ইতালীয় গণমাধ্যম ‘কোরিয়ারে দেল্লা সেরা’ (Corriere del Veneto)-র সাম্প্রতিক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনটি আমাদের সামনে একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উন্মোচন করেছে। মেস্ত্রের ভিয়া পিয়াভে, ভিয়া কাপুচিনা কিংবা করসো দেল পোপোলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো আজ স্থানীয় ইতালীয়দের কাছে “ঢাকাটাউন” (DhakaTown) নামে পরিচিতি পাচ্ছে। এই অভিধা একদিকে যেমন প্রবাসী বাংলাদেশীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উত্থানের প্রতীক, অন্যদিকে তা স্থানীয় ইতালীয় সমাজের একাংশের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।একটি দেশের মূল অর্থনীতি ও জনমিতিতে অভিবাসীদের এই স্তরের প্রভাব বিস্তার স্বাভাবিকভাবেই বহুমাত্রিক আলোচনার জন্ম দেয়। মেস্ত্রের স্থানীয় রাজনীতি আজ স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে ইতালীয় তরুণ সমাজ যখন মেস্ত্রে ছেড়ে অন্য শহরে পাড়ি জমাচ্ছে, ঠিক তখন বাংলাদেশী প্রবাসীরা তাদের কঠোর পরিশ্রম, মেধা ও পুঁজি দিয়ে শহরের পরিত্যক্ত ও বন্ধ দোকানপাট সচল করছেন। আবাসন খাতে তাদের বিশাল বিনিয়োগ স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেছে, যা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। অথচ, এই অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো একে দেখছে একটি ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ হিসেবে।​মেস্ত্রের আসন্ন নির্বাচনে ১৪,৫৯০ জন বিদেশী বংশোদ্ভূত ভোটারের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই (৩,৭৪১ জন) বাংলাদেশী। ইতালীয় নাগরিকদের ভোটবিমুখতার সুযোগে এই ‘রেডি ভোট’ ব্যাংক যে আগামী দিনের মেয়র নির্ধারণে ‘কিং-মেকার’ হতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত। আর এই ভোটের সমীকরণই জন্ম দিচ্ছে নোংরা রাজনৈতিক মেরুকরণের।রাজনীতির দ্বিচারিতা ও অধিকারের প্রশ্ন ডানপন্থী দল ‘ফ্রাতেল্লি ডি’ইতালিয়া’ (FdI)-র মেস্ত্রে সেন্ট্রাল শাখার বোর্ডে বাংলাদেশী তরুণ নেতা প্রিন্স হাওলাদারের অন্তর্ভুক্তি এবং পরবর্তীতে উগ্র ডানপন্থী দল ‘ফোরজা নুওভা’ ও ‘লিগ্যা’র মসজিদ বিরোধী বিক্ষোভের জেরে তার মনোনয়ন বাতিল হওয়া—ইতালীয় রাজনীতির এক চরম দ্বিচারিতাকে প্রকাশ করে। ভোটের প্রয়োজনে অভিবাসীদের কাছে টানা, আবার নিজস্ব কট্টরপন্থী এজেন্ডা রক্ষার্থে তাদের ছুড়ে ফেলার এই নীতি কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হতে পারে না। ভায়া জিউস্তিজিয়ার পরিত্যক্ত করাতকলকে মসজিদে রূপান্তরের আইনি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে “মেস্ত্রের মাটিতে কোনো মসজিদ হবে না” বলে উগ্রপন্থীদের স্লোগান মূলত ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত এবং বহুমাত্রিক সমাজের ধারণার পরিপন্থী।​বিপরীত দিকে, ‘জুলিও সিজার’ বা ‘সিজার বাত্তিস্তি’র মতো স্কুলগুলোতে ইতালীয় শিশুদের চেয়ে বাংলাদেশী ও অন্যান্য দ্বিতীয় প্রজন্মের শিশুদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৬১ জনের মধ্যে ৫০ জন) একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। একে ‘বাংলা সংস্কৃতির আধিপত্য’ বলে লিগ্যা দলের যে সমালোচনা, তা সস্তা রাজনৈতিক স্টান্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। এই শিশুরা ইতালিতেই বড় হচ্ছে, ইতালীয় ভাষায় শিক্ষা নিচ্ছে। তারা ইতালিরই ভবিষ্যৎ করদাতা এবং নাগরিক। তাদের এই বিকাশকে ভীতি হিসেবে না দেখে ইতালির ক্ষয়িষ্ণু জনমিতির জন্য একটি আশার আলো হিসেবে দেখা উচিত।এই উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কামরুল সৈয়দের (Kamrul Syed) মতো প্রবীণ ও দূরদর্শী নেতার অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্র-বামপন্থী জোটের হয়ে নির্বাচনে লড়ার অনড় সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশী কমিউনিটির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তার এই অবিচল অবস্থান প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশী সমাজ এখন আর কেবল ‘শ্রমিক শ্রেণী’ বা ‘ব্যবসায়ী’ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, তারা এখন মূলধারার নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে প্রস্তুত।মেস্ত্রের বাংলাদেশী সম্প্রদায়কে বুঝতে হবে যে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং ভোটের সংখ্যার পাশাপাশি স্থানীয় ইতালীয় সংস্কৃতির সাথে সুসংহত হওয়া বা ‘Integration’-এর কোনো বিকল্প নেই। একইভাবে, ইতালির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে—অভিবাসীরা কেবলই ‘কিল ভোট’ বা শিকার করার মতো কোনো লক্ষ্যবস্তু নয়। তারা এই সমাজের অংশ, করদাতা এবং মেস্ত্রের পুনর্জন্মের কারিগর। উগ্রপন্থা ও বিভাজনের রাজনীতি মেস্ত্রের অর্থনীতি বা সামাজিক শান্তি কোনোটিই ফিরিয়ে আনতে পারবে না। মেস্ত্রের ভবিষ্যৎ এখন আর একক কোনো জাতিসত্তার হাতে নেই; এর ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে পারস্পরিক সহাবস্থান, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং যোগ্য নেতৃত্বের সঠিক মূল্যায়নের মধ্যে।আমরা আশা করি, আসন্ন নির্বাচনে মেস্ত্রের ভোটাররা উগ্রতার পরিবর্তে উন্নয়ন, এবং বিভাজনের পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিকেই বেছে নেবেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত