ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের এক নম্বর রফতানি গন্তব্য। ২০২৫ সালে ইইউ ছিল বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) এক নম্বর উৎস এবং উন্নয়ন অনুদানেরও এক নম্বর উৎস।আমি বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ বিবর্তন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে চাই। ব্রাসেলস থেকে দেখা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রগতি এবং বর্তমানে প্রস্তুত হচ্ছে এমন বড় আয়োজনগুলো নিয়েও বলতে চাই।প্রথম বিষয়। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে একসময় দাতা-গ্রহীতা সম্পর্কের দৃষ্টিতে দেখা হতো। সেখানে ইবিএ বাজার সুবিধার ওপর ছিল অত্যধিক গুরুত্ব। এ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন আমরা অংশীদারত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এটি হবে দ্বিমুখী, আরো রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক, যেখানে বিনিয়োগের সুযোগ প্রসারের ওপর গুরুত্ব থাকবে।এপ্রিল মাসে আমরা সম্পর্কের নতুন চুক্তিভিত্তি, পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন এগ্রিমেন্টের আলোচনা চূড়ান্ত করেছি। যথাসময়ে এর স্বাক্ষর হবে। তবে রাজনৈতিক বার্তাটি হলো অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে আমরা সম্পর্ককে আরো বিস্তৃত ও গভীর করতে চাইইউরোপীয় কাউন্সিল ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীজনদের সাম্প্রতিক চিঠিপত্রের কেন্দ্রেও এ বার্তা রয়েছে।দ্বিতীয় বিষয়। অর্থনৈতিক কূটনীতি আমার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনে আমার দলের জন্য কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বহন করে।ব্যবসার সঙ্গে কাজ করে অশুল্ক বাধা চিহ্নিত করা এবং তা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে এটি রয়েছে। এখনো এ ধরনের বাধা অনেক বেশি। অনির্দেশ্য প্রশাসন ও নীতি থেকে শুরু করে লাইসেন্স, কাস্টমস এবং এর বাইরেও এসব বাধা রয়েছে।ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র ও পৃথক কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করার ক্ষেত্রেও এটি রয়েছে। এ মুহূর্তে আমরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছি, এমন অর্ধ ডজন ঘটনা আমি উল্লেখ করতে পারি।আমাদের সহযোগিতা কার্যক্রমের বিবর্তনের মধ্যেও অর্থনৈতিক কূটনীতি রয়েছে। সেখানে আমরা এমন একটি পদ্ধতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যার কেন্দ্রে থাকবে গ্যারান্টি এবং বেসরকারি খাতে প্রবাহিত বিনিয়োগ।
বেসরকারি খাতের সঙ্গে এ কাজের প্রথম ধাপে চলমান সহায়তার মাধ্যমে এর উদাহরণ দেখা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পরিবেশগত দক্ষতা, পুনর্ব্যবহার এবং কৃষি বর্জ্য থেকে মূল্য সংযোজন।আমাদের পদক্ষেপের অনুরোধ এবং প্রত্যাশা অত্যন্ত স্পষ্ট। ইইউর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারীরা সমান সুযোগে কাজ করবেন, বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করবেন এবং সমস্যা দেখা দিলে প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন সুযোগ পাবেন।ছোট ও অর্থবহ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তবে এর প্রমাণ হবে বাস্তবে এর ফল কী পাওয়া যায়।তৃতীয় বিষয়। বাংলাদেশের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘অফার’ প্রতিযোগিতামূলক।আমরা সহায়তা হিসেবে ঋণ বিক্রি করছি না। অংশীদারত্ব হিসেবে নিয়ন্ত্রণও নয়। আমাদের বাংলাদেশী অংশীজনরা মূল্যায়ন করেন যে আমরা স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির নই। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দুঃসাহসিকতার কারণে বাংলাদেশকে এ মুহূর্তে এত বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।তাই আমরা যখন বলি যে এলডিসি মর্যাদা থেকে একটি মসৃণ উত্তরণকে আমরা সমর্থন করি, তখন আমাদের কথার সঙ্গে রয়েছে কারিগরি সহায়তা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান।যখন আমরা এ দেশের ওপর উত্তরণের প্রভাব দেখি, তখন আমি বলতে পারি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশন কয়েক মাস ধরে এমন একটি সম্পৃক্ততার পদ্ধতির বিবর্তনে সহায়তা করার জন্য কাজ করছে, যা নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা, গভীর সংস্কার ও বাজার উন্মুক্ত করার পক্ষে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করে।আমি এর মাধ্যমে কী বোঝাতে চাই?ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছেন।কমিশন এখন বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কারিগরি যোগাযোগ করবে, যাতে একটি চুক্তির সম্ভাব্যতা ও সম্ভাব্য পরিধি মূল্যায়ন করা যায়।এটি দীর্ঘ পথ। এটি হবে দ্বিমুখী যাত্রা। বাণিজ্য সহজতর করতে, বাধা দূর করতে, মেধাস্বত্ব অধিকার ও আইনের শাসন প্রয়োগ করতে, কার্যকর বাণিজ্যিক আদালতের মাধ্যমেও, ‘সীমান্তের অভ্যন্তরের’ সংস্কার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সক্ষম কিনা, তা আমাদের বিবেচনা করতে হবে। এর ভিত্তিতে কমিশন আলোচনার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে ম্যান্ডেট চাইবে।এটা বলার প্রয়োজন নেই যে এসব কিছুর জন্য শক্তিশালী বার্তা প্রয়োজন হবে যে বাংলাদেশ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোয় ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত। এখানে সমান সুযোগ রয়েছে। বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা হবে। সুশাসন সংস্কার এগিয়ে যাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।আমরা সফল হলে একতরফা সুবিধা থেকে পারস্পরিক, নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য সম্পর্কের দিকে এটি একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন হবে। এর গুরুত্ব আমি অতিরঞ্জিত করে বলতে পারি না।এটি আমাকে আমার চতুর্থ ও শেষ বিষয়টির দিকে নিয়ে আসে।চতুর্থ বিষয় হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন-বাংলাদেশ অংশীদারত্বের কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো এটি টেকসই উন্নয়ন ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ বছর নির্বাচনগুলো বিশ্বাসযোগ্য ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা এরই মধ্যে সম্পর্কের নতুন গতি তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছি।আমার প্রথম ‘ডায়েরিতে তারিখ লিখে রাখার’ বিষয়টি হলো এপ্রিল ২০২৭। এ সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইইউ-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম অনুষ্ঠিত হবে। এর উদ্দেশ্য হবে ব্যবসায়ীরা যে বিষয়গুলো দেখতে চান, সেগুলো বাস্তবায়ন করা। লজিস্টিকস, কৃষি ব্যবসা, তৈরি পোশাক ও চামড়া খাতে সুযোগের ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে। ফোরামের আগে এ বছর ও আগামী বছর বেশকিছু প্রস্তুতিমূলক আয়োজন থাকবে।আমার দ্বিতীয় ‘ডায়েরিতে তারিখ লিখে রাখার’ বিষয়টি হলো জুন ২০২৭। প্রধানমন্ত্রী রহমান ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। পরবর্তী গ্লোবাল গেটওয়ে ফোরাম উপলক্ষে তিনি ব্রাসেলস সফর করবেন।
এটাই ছিল আমার ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গি। অথচ আমি টেকসই পণ্যের জন্য ইকো-ডিজাইন বা পরিবেশবান্ধব নকশা এবং বর্জ্য কাঠামো নির্দেশিকার বিষয়েও আলোচনা করিনি। ইউরোপীয় নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু এ উপলক্ষে আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় নেই।অনেক কিছুই ঘটছে, যেখানে বাংলাদেশের মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।
সূত্র: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশন, বাংলাদেশ

