সোমবার, জুন ৮, ২০২৬

বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে মানবিকতার বন্ধন: একাত্তর, একজন শিক্ষক ও জীবনবোধের গল্প

আপডেট:

​-অধ্যাপক ডাঃ হুমায়ুন কবির বুলবুল

আমার ছাত্রজীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল সমাজের সব অংশের মানুষের সঙ্গে এক ধরনের নীরব সম্পর্কের জাল। ছাত্র-রাজনীতির সূত্রে কলেজের লেকচারার থেকে শুরু করে প্রিন্সিপাল পর্যন্ত প্রায় সবার সঙ্গেই আমার যোগাযোগটা স্বাভাবিক সীমার বাইরে গিয়ে এক ধরনের পারিবারিক ঘনিষ্ঠতায় রূপ নিয়েছিল। আমি সবসময় চেষ্টা করতাম সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে—যেখানে মতের ভিন্নতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতা যেন কখনো হারিয়ে না যায়।এই পথেই আমার জীবনে বিশেষভাবে দাগ কেটে আছেন এক শিক্ষক দম্পতি—আজিজা ম্যাডাম ও ইমাদুল হক স্যার। তাঁদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কখনো একমাত্রিক ছিল না; সেখানে ছিল সম্মান, অভিমান, দূরত্ব, আবার এক গভীর নীরব টানও। তাঁরা যেমন বিভিন্ন সময়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, তেমনি অনেক সময় পরিস্থিতির কারণে হয়তো দাঁড়াতে পারেননি। তবু আমাদের সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি, বরং সময়ের সাথে তা এক ধরনের ব্যক্তিগত ইতিহাসে পরিণত হয়েছে।
​বাহ্যিক অবয়ব ও ভেতরের মানুষ”ইমাদুল হক স্যার ছিলেন ভীষণভাবে ধর্মনিষ্ঠ একজন মানুষ। তাঁর জীবনযাপন, পোশাক, কথাবার্তা—সবকিছুতেই এক ধরনের ইসলামী শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পেত। টেক্সট বইয়ের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন হামদ-কাসিদা-নাত। আধুনিকতার ভেতরেও তাঁর মধ্যে ছিল একটি আলাদা অনুশাসন। অন্যদিকে, আজিজা ম্যাডাম ছিলেন পর্দানশিন, নৈতিকতায় দৃঢ়, মানবিকতায় সমৃদ্ধ এবং ব্যক্তিত্বে অত্যন্ত সংযত একজন মানুষ। তাঁকে দেখে সবসময় মনে হতো—তিনি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক অপরাজিত চরিত্র।
​অথচ, আমার নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে—অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির ধারায় গড়া। ফলে অনেক সময় নিজের মনেই প্রশ্ন জাগত—এই মানুষগুলো, যাঁদের ব্যক্তিগত জীবনধারা ও বিশ্বাস এতটা আলাদা, তাঁরা কীভাবে আমাদের প্রগতিশীল রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি এমন নিঃস্বার্থ ও অকুণ্ঠ সমর্থন দিতে পারেন? আমি বহু বছর ধরে এই প্রশ্নটা নিজের ভেতরে বহন করেছি।এক নিঃসঙ্গ অপরাহ্ণে একাত্তরের গল্প”​সম্প্রতি আজিজা ম্যাডামের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলার সুযোগ হলো। তিনি এখন বড় একা, জীবনের নানা দুঃখ-অভিজ্ঞতায় ভাঙা, কিন্তু ভেতরে অদ্ভুতভাবে স্থির। বাবা-মা, স্বামী, সন্তান—সবাইকে নিয়ে জীবনের নানা অধ্যায় পেরিয়ে তিনি আজ এক নিঃসঙ্গ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। তবু তাঁর কণ্ঠে কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ ছিল না।সেই কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি নিজেই চলে গেলেন একাত্তরের প্রসঙ্গে। ১৯৭১ সালে তিনি এবং ইমাদুল হক স্যার লন্ডনে পোস্টগ্র্যাজুয়েশন করছিলেন। সেখানে তাঁদের সঙ্গে আরও অনেকেই ছিলেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই আজ দেশের রাজনীতিতে সুপরিচিত মুখ (যেমন ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেন)।
​সেখানেই ম্যাডাম শোনালেন তাঁর জীবনের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোটজন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ভাইকে খুঁজতে এসে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে না পেয়ে তাঁর মাকে ধরে নিয়ে যায়। নির্যাতন, বন্দিশিবির, আর অসহ্য অপেক্ষার ভেতর দিয়ে সেই মহিয়সী নারীকে পরে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি আর কখনো সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারেননি। অবশেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরে তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।গল্পটা বলতে বলতে আজিজা ম্যাডামের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছিল, কিন্তু চোখে ছিল না কোনো ভেঙে পড়ার চিহ্ন—ছিল এক ধরনের নীরব গ্রহণযোগ্যতা। যেন বহু বছর ধরে বুকে বয়ে বেড়ানো একটি ভারী ইতিহাস তিনি আজ হালকা করছেন।রাজনৈতিক স্লোগান বনাম জীবনের অভিজ্ঞতাআমি স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম। তখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—যে মুক্তিযুদ্ধকে আমরা অনেক সময় কেবল রাজনৈতিক বা আদর্শিক জায়গা থেকে মূল্যায়ন করি, বহু মানুষের কাছে তা আসলে ব্যক্তিগত বিপুল ক্ষতি, আজীবনের শোক এবং অস্তিত্বের গভীরে গেঁথে থাকা এক তীব্র নৈতিক অভিজ্ঞতা।আজিজা ম্যাডাম বললেন, সেই সময় থেকেই তাঁর ভেতরে একটি অমোঘ বিশ্বাস জন্মেছিল​”মানবিকতা, স্বাধীনতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া কোনো সস্তা রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং জীবন ও মৃত্যুর অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া এক ধরনের পরম নৈতিক দায়।”
​আমি তখন বুঝতে শুরু করলাম, মানুষকে কেবল তার বাহ্যিক ধর্মচর্চা বা রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে পুরোপুরি চেনা বা বোঝা যায় না। কেউ গভীরভাবে ধর্মনিষ্ঠ হয়েও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক হতে পারেন, আবার কেউ প্রগতিশীল রাজনীতির মানুষ হয়েও ব্যক্তিগত বিশ্বাসে ভিন্ন হতে পারেন। মানুষের ভেতরের ইতিহাস, তার জীবনের ক্ষতি, ভালোবাসা আর ট্রমা—সবকিছু মিলেই তার আসল অবস্থানটি তৈরি হয়।ম্যাডামকে আমি আর কোনো প্রশ্ন করিনি। শুধু নিভৃতে শুনে গেছি। কারণ ততক্ষণে আমি বুঝে গিয়েছিলাম—মানুষ আসলে কেবল পুঁথিগত মতবাদের ফ্রেমে বন্দি কোনো জীব নয়, মানুষ গড়ে ওঠে তার যাপন করা গভীর জীবন-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত