এবার বিদেশি ঋণ-সহায়তার অর্থ ছাড়ে উদ্বেগজনক পতন দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুত ঋণ-সহায়তার বিপরীতে প্রকৃত অর্থ ছাড় কমেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। নতুন ঋণের ছাড় কমার পাশাপাশি পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়ায় নিট ঋণ-সহায়তায় এই ধস নেমেছে। এ সময়ে আগের ঋণের আসল পরিশোধ প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে। সার্বিক ঋণ-সহায়তা ছাড়ে পতনের পেছনে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, শর্তপূরণে জটিলতা এবং ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা।তারা বলছেন, বিদেশি ঋণ-সহায়তার বড় অংশই আসে উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে ঋণ ছাড়ের বিষয়টি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যয়সাশ্রয়ী নীতিতে প্রকল্প বাস্তয়নের ধীরগতি দেখা যায়। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পর আগের সরকারের সময়ে নেওয়া অনেক প্রকল্প সংশোধন করা হয়। আবার অনেক প্রকল্পে ঠিকাদার চলে যাওয়ার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ সহায়তাও কমে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনার ওপর জোর দেন তারা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৩০ দশমিক ৩১%, যা গত ৫ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এ সময়ে মোট ৬৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ হাজার কোটি টাকা কম। সংশ্লিষ্টরা জানান, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে কাজের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকায় অর্থ ছাড় আটকে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের শর্ত অনুযায়ী সংস্কার বা নীতিগত পদক্ষেপ সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থ ছাড়ে ধীরগতি বজায় রেখেছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, বিদেশি ঋণ-সহায়তা কমে যাওয়া যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি পরিশোধের চাপ বাড়াও বড় ঝুঁকি। এমনিতেই বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে ডলারের অন্তঃপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা এবং শর্তপূরণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। নতুন সরকারের নীতিগত স্থিতিশীলতা স্পষ্ট হলে বিদেশি ঋণ ছাড় আবারও স্বাভাবিক হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) মোট বৈদেশিক ঋণ-সহায়তার অর্থছাড় হয়েছে ৩০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। এ সময়ে বিগত সময়ে আসা ঋণ-সহায়তার আসল পরিশোধে খরচ হয়েছে প্রায় ১৯৯ কোটি ২৪ লাখ ডলার। ফলে আলোচ্য আট মাসে নিট বৈদেশিক ঋণ-সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ১০৬ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে নিট বৈদেশিক ঋণ সহায়তা ছাড়ের পরিমাণ ছিল ২৩৮ কোটি ৪২ লাখ ডলার। ফলে এবার নিট বৈদেশিক ঋণ-সহায়তা কমেছে প্রায় ৫৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। আগের অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এই কমার হার ছিল ৩৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ।প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পে মোট বিদেশি ঋণ-সহায়তা এসেছে ৩০২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬ দশমিক ৩১ শতাংশ কম। আর খাদ্য সহায়তা হিসেবে এসেছে মাত্র ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে প্রকল্পে ঋণ-সহায়তা এসেছিল প্রায় ৪১০ কোটি ৯৪ লাখ ডরার। আর খাদ্য সহায়তা বাবদ এসেছিল ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সব মিলে এই আট মাসে মোট বৈদেশিক ঋণ সহায়তা এসেছে প্রায় ৩০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে মোট বৈদেশিক ঋণ-সহায়তা আসার পরিমাণ ছিল ৪১৩ কোটি ৪৪ লাখ ডলার।প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৯ কোটি ৪১ লাখ ডলারের নিট ঋণ সহায়তা পাওয়া গেছে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার ছাড় হয়েছে গত বছরের জুলাই মাসে। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩০ কোটি ৯৯ লাখ ডলার ছাড় হয় গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে।বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, দেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় হয়েছিল। ওই অর্থবছরে সব মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিদেশি সহায়তা ছাড় করেছিল উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশগুলো। এটি তার আগের অর্থবছরের চেয়ে সাড়ে ৪৩ শতাংশ বেশি ছিল। তবে আগের ঋণ পরিশোধের পর ওই অথবছরে নিট বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৪৮ কোটি ১৬ লাখ ডলার। এটি তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণ সহায়তা কমে দাঁড়ায় ৯২৫ কোটি ডলার। আর ওই অর্থবছরে নিট বৈদেশিক ঋণ সহায়তা নেমে আসে ৭৫০ কোটি ৬০ লাখ ডলারে। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণ-সহায়তা সামান্য বেড়ে হয় ৯৮২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আর ওই অর্থবছরে নিট ঋণ-সহায়তা দাঁড়ায় ৭৮০ কোটি ২৪ লাখ ডলার। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণ-সহায়তা ফের কমে হয় ৮৫৬ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। আর নিট ঋণ সহায়তা কমে দাঁড়ায় ৫৯৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আর চলতি অর্থবছরে তা আরও নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে।
উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুত ঋণ-সহায়তার বিপরীতে প্রকৃত অর্থ ছাড় কমেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ
আপডেট:

