ইউরোপীয় ইউনিয়নে অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। বুধবার (১৭ জুন) পাস হওয়া এই নতুন নীতিমালায় নির্বাসনের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য ইউরোপের বাইরে ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। গত এক দশকে ইউরোপজুড়ে অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের যে জোয়ার তৈরি হয়েছে এবং চরমপন্থী দলগুলোর জনপ্রিয়তা বেড়েছে, এই নতুন আইন তারই এক চূড়ান্ত প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।২০১৫-১৬ সালে ১০ লক্ষাধিক শরণার্থী ও অভিবাসীর আগমনের পর থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের অভিবাসন নীতিতে কঠোর হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। নতুন এই নীতিমালার চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের সরকারের আনুষ্ঠানিক সায় প্রয়োজন। তবে এই কঠোর নীতি দীর্ঘমেয়াদী সংকটের চেয়ে অভিবাসীদের রুখে দেওয়া এবং তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ওপরই বেশি জোর দিচ্ছে বলে সমালোচনা করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা।ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলভন ডার লিয়েন মঙ্গলবার সদস্য দেশগুলোর নেতাদের উদ্দেশে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, এই নতুন ‘রিটার্ন রেগুলেশন’ বা প্রত্যাবর্তন নীতিমালা নির্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও দ্রুত করার প্রয়োজনীয় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। সদস্য দেশগুলোর অভিযোগ, ভিসা শেষ হয়ে যাওয়া ব্যক্তি এবং আশ্রয়ের আবেদন নাকচ হওয়া অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক এই কঠোর নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন। সোমবার জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে অভিবাসীদের অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে এবং তাদের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে। তুর্ক আরও সতর্ক করে বলেন, নতুন এই নিয়ম ডিটেনশন সেন্টারের ব্যবহার বাড়াবে এবং ‘রিফোলমন্ট’ বা জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ দুর্বল করে দেবে। অভিবাসনের মূল কারণ যেমন- সংঘাত, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিষয়গুলো এড়িয়ে ইউরোপ কেবল দমন-পীড়নের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে বলে মত সমালোচকদের।এরই মধ্যে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে আফগানিস্তানে তালেবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইউরোপীয় কমিশনের যোগাযোগ। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা সত্ত্বেও, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আফগান অভিবাসীদের নির্বাসনের বিষয়ে আলোচনার জন্য তালেবান প্রতিনিধিদলকে ব্রাসেলসে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে ইউরোপীয় কমিশন এবং এই সফরের সহ-আয়োজক সুইডেন দাবি করেছে, এটি একটি প্রযুক্তিগত আলোচনা মাত্র এবং এর মাধ্যমে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রয়টার্সের দেখা একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২২ ও ২৩ জুন ব্রাসেলসে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ইউরোপে অবস্থান করার বৈধ অধিকার নেই এমন আফগান নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হবে। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একজন মুখপাত্র বুধবার জানিয়েছেন, তালেবান প্রতিনিধিদলের ৫ সদস্যের ভিসার আবেদন জমা পড়েছে। তবে বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রিভোট এই আমন্ত্রণের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, তার সরকার তালেবান প্রতিনিধিদের এভাবে আমন্ত্রণ জানানোকে সমর্থন করে না। নিরাপত্তা যাচাই-বাছাইয়ের পরেই কেবল তাদের ভিসা দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।ইউরোপীয় কমিশন অবশ্য জানিয়েছে, কেবল ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ রয়েছে এমন ব্যক্তিদেরই নির্বাসন দেওয়া হবে। তবে তালেবানের সঙ্গে এই আলোচনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নতুন মোড় নিয়েছে, কারণ ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো এখনো তালেবান শাসনকে স্বীকৃতি দেয়নি।
সুত্র :রয়টার্স

