দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত যে সময়টাকে আমরা আধুনিকোত্তর যুগ বা সমকালীন ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত ধরি, সেই ৮০ বছরে বিশ্বে অন্তত ৩০ জন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যতম। এর বাইরে অরাজনৈতিক অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি, যেমন– ক্রীড়াবিদ, সংস্কৃতিসেবী, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকারকর্মী ধরলে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ‘বিবিসি হিস্ট্রি ম্যাগাজিন’ তথা বর্তমানের ‘হিস্ট্রি এক্সট্রা ম্যাগাজিন’ ২০২২ সালের জুন সংখ্যায় ‘যে ৫০টি হত্যাকাণ্ড ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে’ শিরোনামে একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। তাতে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ অব্দের রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার থেকে ২০০৭ সালে নিহত পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো পর্যন্ত আছেন। এই তালিকায় শীর্ষ থেকে ৫ নম্বরের নামটি ‘শেখ মুজিবুর রহমান, নতুন বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা জনক’।ইতিহাসের কালানুক্রমে বা নামের বর্ণানুক্রমে নয়, তালিকাটি সাজানো হয়েছে হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব অনুসারে। তালিকাটিতে বঙ্গবন্ধুর জন্য মাত্র তিনটি দীর্ঘ বাক্যে লেখা পরিচয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ জড়িত থাকার গুঞ্জনের উল্লেখ আছে; শেষ বাক্যটি হচ্ছে, ‘মুজিবুরের হত্যাকাণ্ড নবীন জাতিটিকে বহু বছরের জন্য ধারাবাহিক পাল্টা-ক্যু ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ডুবিয়ে দেয়।’শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জে। যৌবনে তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকামী মুসলিম লীগের কর্মী হলেও পরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার পথে ঐক্যবদ্ধ করেন। এজন্য মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে ১৪ বছরই জেলে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একটি উপদলের হাতে নিহত হন। ওইদিন ভোররাতে তাঁর পরিবার ও নিকট আত্মীয়দের ৪৮ জনকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত যে সময়টাকে আমরা আধুনিকোত্তর যুগ বা সমকালীন ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত ধরি, সেই ৮০ বছরে বিশ্বে অন্তত ৩০ জন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যতম। এর বাইরে অরাজনৈতিক অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি, যেমন– ক্রীড়াবিদ, সংস্কৃতিসেবী, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকারকর্মী ধরলে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ‘বিবিসি হিস্ট্রি ম্যাগাজিন’ তথা বর্তমানের ‘হিস্ট্রি এক্সট্রা ম্যাগাজিন’ ২০২২ সালের জুন সংখ্যায় ‘যে ৫০টি হত্যাকাণ্ড ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে’ শিরোনামে একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। তাতে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ অব্দের রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার থেকে ২০০৭ সালে নিহত পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো পর্যন্ত আছেন। এই তালিকায় শীর্ষ থেকে ৫ নম্বরের নামটি ‘শেখ মুজিবুর রহমান, নতুন বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা জনক’।ইতিহাসের কালানুক্রমে বা নামের বর্ণানুক্রমে নয়, তালিকাটি সাজানো হয়েছে হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব অনুসারে। তালিকাটিতে বঙ্গবন্ধুর জন্য মাত্র তিনটি দীর্ঘ বাক্যে লেখা পরিচয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ জড়িত থাকার গুঞ্জনের উল্লেখ আছে; শেষ বাক্যটি হচ্ছে, ‘মুজিবুরের হত্যাকাণ্ড নবীন জাতিটিকে বহু বছরের জন্য ধারাবাহিক পাল্টা-ক্যু ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় ডুবিয়ে দেয়।’শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জে। যৌবনে তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকামী মুসলিম লীগের কর্মী হলেও পরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার পথে ঐক্যবদ্ধ করেন। এজন্য মাত্র ৫৫ বছরের জীবনে ১৪ বছরই জেলে কাটাতে হয়েছে তাঁকে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একটি উপদলের হাতে নিহত হন। ওইদিন ভোররাতে তাঁর পরিবার ও নিকট আত্মীয়দের ৪৮ জনকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, ১০ বছরের কনিষ্ঠসহ তিন পুত্র, সদ্য বিবাহিত পুত্রবধূও রয়েছেন। দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় বেঁচে যান। ছয় বছর পরে দেশে ফিরে এসে শেখ হাসিনা পরবর্তী ৪৫ বছর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেন এবং মাঝে ছেদ দিয়ে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। শেষ দফায়, ২০২৪ সালের আগস্টেই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করেন। দেশের একটি আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। পচাত্তরের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর গত অর্ধশতাব্দীতে একাধিকবার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে তারিখটিকে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালনে বাধা এসেছে; দিবসটির সরকারি মর্যাদা অপসারিত ও পুনর্বহাল হয়েছে। আমাদের দেশের দুরপনেয় রাজনৈতিক বিভক্তির ফল হিসেবে এ বছরও দিবসটির সরকারি স্বীকৃতি নেই। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ। তবে তাতে স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ আটকে রাখা যাবে, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের চক্রান্তে আওয়ামী লীগেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতা ও তখনকার মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ জড়িত ছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি হয়ে বসেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য মোশতাকের সন্দেহজনক ভূমিকা ধরা পড়ে এবং তাঁকে নজরে রাখা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এলে তিনি পুনরায় দল ও সরকারের অন্দরমহলে প্রবেশ করেন।পঁচাত্তরের পূর্বাপর রাজনীতির ভাষ্যকার মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডকে তৎকালীন পাকিস্তান-মার্কিন বনাম ভারত-সোভিয়েত পরাশক্তির শীতল যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনিসহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই হত্যাকাণ্ডের পর দেশের আদর্শগত মোড় পরিবর্তনকেও চিহ্নিত করেন। আমরা এখনও লক্ষ্য করি, বঙ্গবন্ধুর প্রবল সমালোচকরাও অস্বীকার করেননি যে, মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী অধ্যায়ে তিনি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বায়ত্তশাসনের দ্ব্যর্থহীন নেতা ছিলেন ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তবে স্বাধীনতার পরে তিনি ক্রমে স্বৈরশাসক হয়ে ওঠেন। ১৯৭২-৭৫ সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের প্রচণ্ড চ্যালেঞ্জ ছিল; কিউবার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রশ্নে মার্কিন অসহযোগিতা এবং পরপর বন্যার কারণেও ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ ঘটে। ডানপন্থি ও অতিবামপন্থিরাও নানা নাশকতায় সরকারকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। আওয়ামী লীগেরই একাংশ জাসদ গঠন করে মুজিব সরকারের প্রবল বিরোধিতা করতে থাকে। আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল নামে একক জাতীয় দল গঠন নতুন দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।
যদিও বাকশালের সমর্থকরা বলে থাকেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় বা একনায়কত্ব ছিল ‘সাময়িক পদক্ষেপ’। মূল দিকটি ছিল ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ নামে অভিহিত সমবায়ের ওপর জোর দিয়ে শোষণহীন সমাজতন্ত্রমুখীন জনকল্যাণকর অর্থনীতি। দুর্ভাগ্যবশত, কয়েক মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু নিহত হলে অতি সংক্ষিপ্ত বাকশালযুগ দেশের ইতিহাসে বিতর্কিত ও অপরীক্ষিত অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। এখনকার বাস্তবতা হচ্ছে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সমালোচনা কেবল বাকশালে সীমিত নেই; রীতিমত কুৎসা রটনা চলছে। যারা এসব করছেন, তাদের স্লোগান ও রাজনৈতিক বয়ানে আবার বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী পাকিস্তানের প্রতি অনুরাগ স্পষ্ট। অবশ্যই শেখ হাসিনা তাঁর শেষ তিন দফার শাসনকালে নির্বাচনে বড় বড় কারচুপি, বিরোধী দলের ওপর দমনপীড়ন, সরকারি ও দলীয় পর্যায়ে ভয়াবহ দুর্নীতি করেছিলেন। সেই কারণে জনমনে প্রচণ্ড ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিলেন এবং জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। সর্বশেষ কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে বিপুল প্রাণহানি ও রক্তপাত ঘটিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই যেভাবে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ও ভাস্কর্যগুলো ভেঙে ফেলা হলো এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, ম্যুরাল, জাদুঘর আক্রান্ত হলো, সেটা আর যাই হোক কেবল আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা সরকারের বিরোধিতা হতে পারে না।বিস্ময়কর ব্যাপার, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুর একনায়কত্ব ও দুর্নীতিকে সামনে এনে আক্রমণ করা হয়েছিল, আর এখন বলা হচ্ছে তিনি স্বাধীনতা চাননি, স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। প্রচার চালানো হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রণীত বাহাত্তরের সংবিধানই বাংলাদেশের যত সমস্যার মূলে।কথা হলো, একাত্তরে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, সেই দেশি-বিদেশি শত্রুরা মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যতই বাণ নিক্ষেপ করুক, কিছুই তাঁকে বিদ্ধ করতে পারবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ, বাংলাদেশের মানুষের জন্য তাঁর ভালোবাসা ও আবেগ শত কুৎসায় ঢেকে দেওয়া যাবে না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বরং দেখা গেছে, ধান্দাবাজ ও তেলবাজদের বাইরে প্রকৃত ভক্ত ও অনুসারীরা বঙ্গবন্ধুকে সত্যিকার শোক ও শ্রদ্ধায় অধিকতর স্মরণ করছেন; মবতন্ত্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। আমি নিশ্চিত, যত দিন যাবে, জনমনে বঙ্গবন্ধুর আসন আরও দৃঢ় হবে।
মোজাম্মেল হোসেন: মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক
দৈনিক সমকাল থেকে


