প্রধান সম্পাদক
আনোয়ার মোরশেদ মজুমদার
ইয়াবা ও আইসের মতো প্রাণঘাতী মাদকের অবাধ বিস্তারে আজ পুরো বাংলাদেশ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। শহর থেকে গ্রাম, অলিগলি থেকে উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম—মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্ত নয় কোনো স্তরই। এই মরণনেশার প্রত্যক্ষ প্রভাবেই সমাজজুড়ে খুন, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ মহামারী আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি রংপুরে মাদকের বাধা রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনার নতুন তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, নেশা করতে বাধা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটক দুজন জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যা কিংবা ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি প্রমাণ করে, অপরাধীরা এখন আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তোয়াক্কা করছে না।এই সর্বগ্রাসী সংকটের নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও প্রশাসনের একাংশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রছায়া। সীমান্তে নজরদারির শিথিলতা এবং গডফাদারদের অধরা থেকে যাওয়া পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জঘন্য করে তুলছে। কথিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কেবল কাগজে-কলমে বা নীতিবাক্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, বাস্তবতার তলে তা আজ তলিয়ে গেছে। মাদকের সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে অঢেল মুনাফার লোভে, যেখানে আজ হাজারো তরুণ তাদের ভবিষ্যৎ বিকিয়ে দিচ্ছে।তবে যারা আজ এই অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন, তাদের মনে রাখা উচিত—প্রকৃতির বিচার বড় নির্মম। যে বিষ তারা সমাজে ছড়াচ্ছেন, তা কোনো না কোনোভাবে তাদের নিজেদের ঘরেই আগুন জ্বালবে। কোনো পরিবারই এই দাবানল থেকে নিরাপদ নয়।মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে এখনই চাই কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ:
সিন্ডিকেট নির্মূল: রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিচয় না দেখে মাদকের আসল গডফাদার ও অর্থ জোগানদাতাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা।
সীমান্তে কঠোর নজরদারি: মিয়ানমার সীমান্তসহ প্রবেশপথগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মাদকের চালান পুরোপুরি বন্ধ করা।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: মাদক সংক্রান্ত অপরাধ ও এর থেকে সৃষ্ট অন্যান্য সহিংসতার দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ আদালত কার্যকর করা।সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিরোধ: প্রতিটি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং তরুণদের খেলাধুলা ও সুস্থ সংস্কৃতিতে যুক্ত করা।শুধুমাত্র চুনোপুঁটি গ্রেপ্তার করে এই মরণনেশা বন্ধ করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে এই অপরাধ চক্রের মূল উপড়ে ফেলতে হবে, অন্যথায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্জিত সব উন্নয়ন।

