প্রধান সম্পাদক
আনোয়ার মোরশেদ মজুমদার
সাম্প্রতিক সময়ে সোশাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে ভেসে আসা একটি দৃশ্য পুরো দেশের মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। চুরির দায়ে গাছের সাথে হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে এক বাবাকে। তার পাশে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে এক পুতুলতুল্য নিষ্পাপ শিশুকন্যা। চারপাশে মানুষের ভিড়, গালিগালাজ আর অপমানের ছড়াছড়ি—কিন্তু কোনো কিছুই সেই শিশুর পিতৃস্নেহ আর ব্যাকুলতাকে থামাতে পারছে না। নিজের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে চোর অপবাদ পাওয়া বাবার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে সে।একদিন যিনি ছিলেন অর্থ-বিত্ত, বংশ মর্যাদা ও সামাজিক সম্মানের অধিকারী—মাদকের অভিশপ্ত ছোঁয়ায় আজ তিনি নিঃস্ব, সমাজচ্যুত এবং একজন সামান্য ছিঁচকে চোর। এটি কেবল একজন ব্যক্তির পতন নয়, এটি আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থার মুখে এক বড় চড়।কাঠগড়ায় সমাজ ও আমাদের বিবেক
আজ যারা সমাজের দায়িত্বে রয়েছেন—প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক কিংবা আমলা—তারা কি একবারও ভাবছেন এই শিশুটির ভবিষ্যৎ কোথায়?
নিজের সন্তানের আয়নায় বিচার করুন: যারা সামান্য ঘুষের বিনিময়ে মাদক কারবারিদের ছেড়ে দিচ্ছেন, বা টাকার লোভে এই মরণব্যাধির বাণিজ্যকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন—তারা কি একবারও নিজের সন্তানকে ওই মেয়েটির জায়গায় রেখে কল্পনা করেছেন?
আগামীর করুণ পরিণতি: আজ যে ডিলারকে আপনি ছেড়ে দিচ্ছেন, তার ছড়িয়ে দেওয়া বিষ হয়তো কাল আপনারই কোনো সন্তান, কোনো স্বজন বা আপনার আপন কন্যার জীবন ধ্বংস করে দেবে। আপনার কন্যাসন্তানের স্বামী বা প্রিয় বন্ধুটি যদি মাদকের বিষে নিঃশেষ হয়ে যায়, তবে তার জীবনটা কেমন নরকতুল্য হবে—তা কি ভেবে দেখেছেন?
নগণ্য কিছু টাকার বিনিময়ে নিজের দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো সুস্থ ও বিবেকবান মানুষের কাজ হতে পারে না।
কেবল চুনোপুঁটি নয়, ধরতে হবে মূল রাঘববোয়ালদের
আমাদের দেশে প্রায়শই দেখা যায়, মাদকের মামলায় ধরে আনা হয় কিছু পথশিশু, খুচরা বিক্রেতা বা আসক্তদের—যারা নিজেরাই এই ব্যাধির শিকার। কিন্তু যারা এই বিষের মূল কারবারি, কোটি টাকার ডিলার বা গডফাদার, তারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ডিলারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: আইনি ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হতে হবে মাদকের ডিলার ও রুট চেইন ধ্বংস করা। কোনোভাবেই যেন গডফাদাররা রেহাই না পায়।
জিরো টলারেন্স নীতি: ঘুষ বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
সামাজিক জাগরণ: ডাক্তার, আইনজীবী, আমলা, শিক্ষক ও সাংবাদিকদের একজোট হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে জোরদার গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
সেই অবুঝ শিশুটির কান্না আজ বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। আর কোনো কন্যাসন্তান যেন তার বাবার এমন করুণ পতন না দেখে, আর কোনো পরিবার যেন মাদকের আগুনে ছাই না হয়—সেজন্য আজই আমাদের একসুরে বলতে হবে: মাদককে ‘না’ বলুন, সমাজকে রক্ষা করুন।

