বৃহস্পতিবার, জুন ৪, ২০২৬

নূর জাহান বেগমের করুণ মৃত্যু”আমাদের তথাকথিত ‘প্রতিষ্ঠা’ ও সামাজিক দেউলিয়াত্বের “এক নগ্ন দলিল

আপডেট:

সারমিন সুলতানা
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক সকালের কন্ঠ

মিরপুরের নূর জাহান বেগমের করুণ ও নিঃসঙ্গ মৃত্যুতে আজ পুরো সমাজ স্তব্ধ, বিবেক আজ প্রশ্নবিদ্ধ। একজন মা—যিনি নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে তিনজন ছেলে ও এক মেয়েকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাকে এমন অবহেলা আর নির্মমতার শিকার হতে হবে, তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। এক সপ্তাহ ধরে একজন মা নিজের ঘরে মৃত অবস্থায় পড়ে রইলেন, অথচ সমাজে উচ্চপদে আসীন তাঁর প্রতিষ্ঠিত সন্তানেরা কেউ তাঁর খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না! এটি শুধু দুঃখজনক নয়, পুরো মানবজাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
​এখানে ‘প্রতিষ্ঠিত’ শব্দটা যেন আজ এক চরম বিদ্রূপ ও উপহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আসলে ‘প্রতিষ্ঠা’ বলতে কী বুঝি? শুধু অর্থ, উচ্চ পদমর্যাদা, বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি কিংবা সামাজিক অবস্থান?​প্রকৃত প্রতিষ্ঠা তো নিহিত থাকে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা এবং কৃতজ্ঞতাবোধের মধ্যে। যে সন্তানরা তাদের জন্মদাত্রী মায়ের ন্যূনতম খোঁজ নেওয়ার মানবিকতা দেখায় না, তাদের তথাকথিত এই সফলতার মূল্য কোথায়? এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তাদের আচরণ নিঃসন্দেহে পশুতুল্য। এমনকি বন্য পশুরাও অনেক সময় তাদের দলের বা সঙ্গীদের প্রতি যে সহমর্মিতা দেখায়, এই সন্তানদের আচরণে সেই ন্যূনতম বোধটুকুও অনুপস্থিত ছিল।এই ঘটনা আমাদের সমাজে পারিবারিক বন্ধনের ক্রমাগত এবং ভয়াবহ ভাঙনের দিকেই আঙুল তোলে। আমরা দিন দিন এক চরম আত্মকেন্দ্রিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে ‘আমি এবং আমার সুরক্ষাই’ শেষ কথা। যে বাবা-মা আমাদের আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন, সমাজ নামক এই প্রতিযোগিতার বাজারে আজ তারা অনেকের কাছেই ‘বোঝা’ কিংবা অপ্রয়োজনীয় এক দায়িত্বে পরিণত হয়েছেন। ফলে বৃদ্ধ বয়সে তাদের স্থান হচ্ছে ঘরের কোনো অন্ধকার কোণে, অথবা কোনো বৃদ্ধাশ্রমে। এই মানসিকতা কেবল অমানবিকই নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর এক গভীর সংকটের অকাট্য প্রমাণ।
​তাই নূর জাহান বেগমের এই মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটা পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ব্যর্থতার এক জীবন্ত দলিল।
​আমাদের আজ শক্তভাবে মনে রাখতে হবে—যে মা-বাবা আমাদের পৃথিবীতে এনেছেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বড় করেছেন, তাদের শেষ বয়সে পাশে দাঁড়ানো কোনো দয়া বা করুণা নয়; এটি সন্তানের পরম কর্তব্য এবং মানবিকতার সর্বোচ্চ পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া মানে শুধু একজন সন্তানের ব্যর্থতা নয়, এটি পুরো সমাজের নৈতিক পরাজয়।এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে শুধু মুখের নৈতিক শিক্ষা বা সাময়িক সামাজিক সচেতনতা যথেষ্ট নয়। এখন সময় এসেছে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে, অবহেলা করে তাদের বৃদ্ধ মা-বাবার দেখভাল করবে না বা তাদের এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। সমাজে একটা শক্ত ও স্পষ্ট বার্তা যাওয়া প্রয়োজন যে—বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।আমরা আর কোনো নূর জাহান বেগমের এমন নিঃসঙ্গ, পচাগলা লাশ দেখতে চাই না। সমাজ এবং আইনের যৌথ দায়বদ্ধতাই পারে আমাদের পরিবারগুলোকে এই চরম নৈতিক পতন থেকে রক্ষা করতে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত