মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬

বেসরকারি হাসপাতালে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লোটার ‘নীতিহীনতা’র অবজ্ঞা ও বৈষম্যের জবাব : ডাঃ তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী

আপডেট:

সংযোগ ও সংকলন সারমিন সুলতানা : ২৬ বছর আগের এক অবজ্ঞা ও বৈষম্যের জবাব দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন ডাঃ তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী। দেশের চিকিৎসা খাতে লিঙ্গবৈষম্যের দেয়াল ভেঙে তিনি আজ একজন সফল ফিমেল জেনারেল সার্জন ও ইউরোলজিস্ট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমানে তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেনসম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ ২৬ বছরের কঠিন ও গৌরবময় এই লড়াইয়ের গল্প উঠে এসেছে, যা চিকিৎসক সমাজসহ সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।অবজ্ঞা থেকে শুরু, অতঃপর ইতিহাস জয়। দীর্ঘ ২৬ বছর আগের এক ইন্টারভিউ বোর্ডের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মৃতিচারণ করে ডাঃ তাজকেরা জানান, সেদিন তাঁকে সরাসরি বলে দেওয়া হয়েছিল—”ইউরোলজি বিভাগে আমরা নারী চিকিৎসক নিব না। নারী ডাক্তার দিয়ে এই বিভাগ চালানো চিকিৎসক ও রোগী উভয়ের জন্যই বিব্রতকর!”সেদিন সেই অন্যায্য সিদ্ধান্তের জবাবে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, একজন নারী রোগীর জন্য পুরুষ চিকিৎসকের কাছে ইউরোলজিক্যাল সেবা নেওয়া কতটা অস্বস্তিকর। তবে তাঁর এই যৌক্তিক প্রশ্নকে সেদিন অবজ্ঞা করা হয়েছিল। সেই অবজ্ঞাই তাঁর ভেতর তৈরি করে এক তীব্র জেদ। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, মেধা ও সেবার সামনে লিঙ্গ যে কোনো বাধা নয়, তা তিনি প্রমাণ করেই ছাড়বেন।২০১৩ সাল পর্যন্ত কেউ আসেনি এই পথে জেনারেল সার্জারি দিয়ে চিকিৎসা পেশার যাত্রা শুরু হলেও ইউরোলজির মতো একটি পুরুষ-শাসিত সার্জিক্যাল ডিসিপ্লিনে নিজেকে প্রমাণ করা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই। ২০১৩ সাল পর্যন্ত কোনো নারী শিক্ষার্থী এই প্রফেশনাল ডিগ্রীর জন্য আসেননি। ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান পরিবর্তনের জটিলতায় এক বছর অপেক্ষাসহ নানা প্রতিকূলতায় অনেক সময় মনে হয়েছিল হয়তো আর হবে না। কিন্তু সব বাধা পেরিয়ে তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত ডিগ্রী অর্জন করতে সক্ষম হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ সীমিত থাকায় তিনি নিজের উদ্যোগে দেশের বাইরে স্বনামধন্য ইউরোলজিস্টদের অধীনে রেসিডেন্সি ও লাইভ সার্জারি ডেমোনস্ট্রেশনে অংশ নিয়ে নিজেকে দক্ষ করে তোলেন।
​”মুনাফার চেয়ে মেডিকেল এথিক্স বড়”
​দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন নামী বেসরকারি হাসপাতালে প্র্যাকটিস করার সুযোগ হলেও, হাসপাতালগুলোর মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লোটার ‘নীতিহীনতা’র সাথে সবসময় দ্বিমত পোষণ করেছেন ডাঃ তাজকেরা সুলতানা।
​”প্রয়োজন না থাকলেও অতিরিক্ত টেস্ট বা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার চাপ আমার পেশাগত সততার সাথে সাংঘর্ষিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গাইডলাইন মেনে যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই চিকিৎসা নিশ্চিত করা—এই ছিল আমার ব্রত। আর এ কারণেই আমি অনেক বড় প্রতিষ্ঠান ছেড়েছি। কারণ, আমি কখনো আমার নীতি ও মেডিকেল এথিক্সের সাথে আপস করিনি।”
— ডাঃ তাজকেরা সুলতানা চৌধুরী
​২৬ বছরের সাধনা ও রোগীদের অবিচল বিশ্বাস
​স্কুল জীবন, এমবিবিএস, ইন্টার্নশিপ, আড়াই বছরের অবৈতনিক উচ্চশিক্ষা এবং চার বছরের রেসিডেন্সি—সব মিলিয়ে প্রায় ছাব্বিশ বছরের নিরন্তর সাধনার পর আজ তিনি যে অবস্থানে পৌঁছেছেন, তার মূল ভিত্তি রোগীদের বিশ্বাস। ডাঃ তাজকেরা জানান, তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো তাঁর পুরোনো রোগীরা সুস্থ হয়ে যখন নিজ দায়িত্বে পরিচিতদের তাঁর কাছে রেফার করেন।
​”চিকিৎসা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি দায়বদ্ধতা”—এই নীতিকে বুকে ধারণ করেই আজীবন রোগীদের সেবা করে যেতে চান দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রের এই অনন্য রোল মডেল।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত