রবিবার, জুন ১৪, ২০২৬

জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বিদেশি গাছের মোহ ছেড়ে দেশীয় ফলজ বৃক্ষে ফেরার সময় এখনই

আপডেট:

​প্রধান সম্পাদক
আনোয়ার মোরশেদ মজুমদার (বিটু)

সরকার আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণের যে মহাপরিকল্পনা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, তা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো একটি বদ্বীপের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় এই উদ্যোগ বিপুল অবদান রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা দেশের সাধারণ মানুষের। তবে যেকোনো মহৎ পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করে তার সঠিক ও দূরদর্শী বাস্তবায়নের ওপর। বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি নানা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে দেশীয় প্রজাতির চেয়ে বিদেশি ও আগ্রাসী প্রজাতির গাছ লাগানোর এক আত্মঘাতী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, চলমান মহাপরিকল্পনায় দেশীয় ফলজ গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবিটি এখন সময়ের দাবি।
​আমাদের মাটি ও চিরায়ত প্রকৃতির সাথে মিশে আছে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুর মতো ঐতিহ্যবাহী গাছ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বনায়ন বা সৌন্দর্যবর্ধনের নামে ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি, রেইনট্রি বা মেহগনির মতো বিদেশি গাছের জয়জয়কার দেখা গেছে। এই গাছগুলো আমাদের ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত শোষণের পাশাপাশি স্থানীয় পাখির আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খল ধ্বংস করছে। অথচ বাংলাদেশ যে চিরসবুজ রূপের জন্য পরিচিত, তার মূল ভিত্তি ছিল আমাদের দেশীয় বনজ ও ফলজ উদ্ভিদ।একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বনায়ন নিশ্চিত করতে হলে চলমান এই ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির অনন্ত ৫০ শতাংশ গাছ দেশীয় ফলজ গাছের জন্য নির্ধারিত করা জরুরি। বিশেষ করে আমাদের ঐতিহ্য ও গ্রামীণ জনপদ থেকে ক্রমশ বিলুপ্তির পথে থাকা বেল, জাম, বড়ই, কামরাঙ্গা, আমলকী, আতা, কাউফল, ডুমুর, খেজুর ও তালের মতো স্থানীয় ফলগাছ রোপণের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে।জাতীয় বৃক্ষরোপণ নীতিতে এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে তিনটি শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ রক্ষা: দেশীয় ফলগাছ আমাদের স্থানীয় পাখি, কীট-পতঙ্গ এবং কাঠবিড়ালির মতো বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়। বিদেশি গাছে পাখিরা বাসা বাঁধে না, ফলও পায় না। ফলে প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। দেশীয় গাছ লাগালে জীববৈচিত্র্য আবার প্রাণ ফিরে পাবে।পুষ্টি নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতি: গ্রামীণ সড়কের পাশে, বাঁধ বা পতিত জমিতে দেশীয় ফলগাছ রোপণ করা হলে তা গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদা মেটাবে। পাশাপাশি এই ফলগুলো বিক্রি করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনা সম্ভব।​বজ্রপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা: তাল ও খেজুরের মতো দীর্ঘজীবী দেশীয় গাছ বজ্রপাত প্রতিরোধে ঢাল হিসেবে কাজ করে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অন্যতম বড় দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এছাড়া মাটির ক্ষয়রোধ ও ঝড়-ঝাপটা মোকাবিলায় দেশীয় গাছের শিকড় অনেক বেশি কার্যকর।আমরা মনে করি, শুধু সংখ্যার বিচারে ২৫ কোটি গাছ লাগিয়ে কাগজে-কলমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলেই পরিবেশ রক্ষা পাবে না। যদি সেই গাছের সিংহভাগই হয় পরিবেশের জন্য অনুপযোগী, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে হিতে বিপরীত হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ এবং ফল-ফলাকার্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ রেখে যেতে হলে আমাদের শেকড়ের দিকে তাকাতেই হবে।অতএব, নীতিনির্ধারকদের প্রতি আমাদের বিনীত ও জোর দাবি—জাতীয় বৃক্ষরোপণ নীতিতে অবিলম্বে সংশোধন এনে মোট লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক অংশ দেশীয় এবং বিলুপ্তপ্রায় ফলজ বৃক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক করা হোক। পরিকল্পিতভাবে দেশীয় ফলজ গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমেই কেবল এই মহাপরিকল্পনাকে সত্যিকারের পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করে তোলা সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত