এই কিছুদিন আগপর্যন্ত যে পর্তুগাল ছিল অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতার স্বর্গরাজ্য, সেই পর্তুগালে এখন চলছে ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর অভিবাসন নিয়ম। পর্তুগালে স্থায়ী হওয়া সেলিম আখন্দ জানান, বৈধভাবে ঢুকলে ৬ মাসেই রেসিডেন্ট পারমিট পাওয়া যেত। অবৈধভাবে ঢুকলে কাজের কন্ট্রাক্ট বের করলে ১২ মাসের মধ্যেই রেসিডেন্ট পারমিট পাওয়া যেত। যা ইউরোপের মধ্যে একমাত্র পর্তুগালেই সম্ভব ছিল।জানা যায়, পর্তুগালে ডানপন্থি সরকার ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক কঠোর অভিবাসন আইন ও নীতিগত পরিবর্তন দেশটিতে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, নাগরিকত্ব আইন কঠোর করা এবং পরিবার পুনর্মিলনের সুযোগ সীমিত করার উদ্যোগকে সরকার দেশের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্ত দেশটির অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৫ সালে পর্তুগালের সরকার ঘোষণা দেয়, অনুমোদনহীনভাবে বসবাসরত প্রায় ১৮ হাজার বিদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ জনকে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের জন্য নোটিস দেওয়ার কথা জানানো হয়।বাকি ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়। সরকার এটিকে অভিবাসন ব্যবস্থার সংস্কার এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জট কমানোর অংশ হিসেবে উল্লেখ করে।একই সময়ে দেশটিতে প্রায় ৪ লাখ পেন্ডিং অভিবাসন আবেদন পর্যালোচনার উদ্যোগও নেওয়া হয়। সরকারের দাবি, অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নিয়ন্ত্রিত করার লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে পর্তুগালে বসবাসরত অনেক অভিবাসী মনে করেন, কর্মসংস্থান ও জনশক্তির ঘাটতিতে ভোগা দেশের জন্য এমন সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে। পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবার পুনর্মিলন ভিসা এবং নাগরিকত্বসংক্রান্ত নীতিমালায়ও পরিবর্তনের প্রস্তাব আনে। বর্তমানে পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা গেলেও নতুন প্রস্তাবে সেই সময়সীমা ১০ বছরে উন্নীত করার কথা বলা হয়। আবেদন জমা দেওয়ার পর অনুমোদনের জন্য অপেক্ষার সময়কে বৈধ বসবাসের অংশ হিসেবে গণ্য করার দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়। সরকার আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা মূলত উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মীদের জন্য সীমিত করা হতে পারে।
ভাষাজ্ঞানকেও মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টিনেগ্রোর সরকার বলছে, নিম্ন দক্ষতার শ্রম অভিবাসনের পরিবর্তে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের আকৃষ্ট করাই তাঁদের অগ্রাধিকার। এদিকে ২০২৬ সালে পর্তুগালের সংসদে নাগরিকত্ব বাতিলসংক্রান্ত একটি নতুন আইন পাস হওয়ার পর নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আইন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব অর্জনের সময় ভুল তথ্য প্রদান, প্রতারণা কিংবা গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে নাগরিকত্ব বাতিল করা যেতে পারে। সরকার বলছে, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও অভিবাসী অধিকারকর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, আইনের অপব্যবহার হলে অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অনেক অভিবাসীও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বিশেষ করে নতুন নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো পর্তুগালের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং সামাজিক সংহতির ওপর কতটা পড়বে, তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত দেশটিতে বসবাসরত হাজারো অভিবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
অবৈধ অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য পর্তুগাল কঠোর অভিবাসন নীতি উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে
আপডেট:

