বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২৬

সময়ের দাবি কিশোর অপরাধ দমনে যুগোপযোগী ও কঠোর আইনের প্রয়োজনীয়তা

আপডেট:

সময়ের দাবি: কিশোর অপরাধ দমনে যুগোপযোগী ও কঠোর আইনের প্রয়োজনীয়তা
​সম্পাদকীয়
​প্রধান সম্পাদক
আনোয়ার মোরশেদ মজুমদার (বিটু)

রাজধানীসহ সারা দেশেই এখন কিশোর অপরাধ এক আতঙ্কের নাম। চুরি, ছিনতাই, পাড়া-মহল্লায় প্রভাব বিস্তার, মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষকে কুপিয়ে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোরেরা। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মুখরোচক নামে গ্রুপ বা গ্যাং তৈরি করে এরা সংগঠিত হচ্ছে। সামাজিক কাঠামোর ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা এবং অপরাধের ধরন পরিবর্তনের এই যুগে বাংলাদেশকে শাসন করছে কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি। দীর্ঘকালের পুরোনো ব্রিটিশ আমলের আইনি কাঠামো দিয়ে আজকের ‘ডিজিটাল গ্যাং’ ও আধুনিক কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যে অসম্ভব, তা প্রতিদিনের খবরের কাগজ খুললেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ইতালির সাম্প্রতিক একটি পদক্ষেপ আমাদের নতুন করে ভাবার খোরাক জোগায়।​সম্প্রতি ইতালির মন্ত্রিসভা কিশোর অপরাধ ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে একটি যুগান্তকারী অধ্যাদেশ জারি করেছে। অধ্যাদেশটিতে অপরাধের ধরন ও তার পরিণতির ওপর জোর দিয়ে আধুনিক যুগের অপরাধ দমনের বেশ কিছু কঠোর ও বাস্তবমুখী ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে:
​সহিংসতার কঠোর সাজা: কোনো মিছিল বা জনসভায় পাঁচ বা তার বেশি মানুষ দলবদ্ধ হয়ে পাথর, লাঠি বা আতশবাজি ছুড়ে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার ইউরো জরিমানা করা হবে। মুখ ঢেকে অপরাধ করলে বা কাউকে আহত করলে শাস্তি আরও বাড়াবে রাষ্ট্র।ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দল গঠন প্রতিরোধ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যারা সহিংস কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে দল গঠন বা সংগঠিত করবে, তাদের জন্য ৪ থেকে ১২ বছরের কঠোর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে—যা গ্যাং কালচারের মূলোৎপাটনে অত্যন্ত কার্যকর।
​অভিভাবকের জবাবদিহিতা ও ক্ষতিপূরণ নীতি: সরকার “যে ভাঙবে তাকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে” নীতি গ্রহণ করেছে। কোনো সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিনষ্ট করলে অপরাধীকে তার জরিমানা দিতে হবে। আর অপরাধী অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে সেই ক্ষতিপূরণ বহনের পূর্ণ দায়ভার অভিভাবক অর্থাৎ বাবা-মায়ের ওপর বর্তাবে।
​অপরাধ বোঝার মানসিক সক্ষমতার আইনি ধারণা পরিবর্তন: ইতিপূর্বে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের অপরাধের ক্ষেত্রে তারা অপরাধের ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছিল কি না—তা রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হতো। নতুন অধ্যাদেশে ধরে নেওয়া হয়েছে, আধুনিক যুগের কিশোররা তাদের কৃতকর্মের পরিণাম বোঝে (অন্যথা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত)।​প্রতিরোধমূলক আটক আইন বিস্তার: এতদিন ধরে কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ‘প্রতিরোধমূলক আটক’ (Preventive Detention) আইনটি এখন অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগযোগ্য করা হয়েছে।​আমাদের দেশের আইন সংস্কারে ইতালি সরকারের গৃহীত এই পদক্ষেপসমূহ একটি আদর্শ মডেল বা রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকদের বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।​বাংলাদেশে গ্যাং কালচারের যে ভয়াবহ রূপ আমরা দেখছি, সেখানে কেবল অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে শিথিল সাজা দেওয়া কিংবা ব্রিটিশ আমলের সংস্কারভিত্তিক আইন প্রয়োগ করে সুফল মিলছে না। অপরাধীরা তাদের ‘নাবালক’ পরিচয়ের আইনি সুযোগ নিয়ে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে বা তাদের গডফাদাররা সুযোগ নিচ্ছে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কার সঙ্গে কী উদ্দেশ্যে জোট বাঁধছে—তার দায়ভার পিতামাতাকেও কিছুটা নিতে হবে। ক্ষতিপূরণ নীতি চালু হলে অভিভাবকরাও সন্তানদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে বাধ্য হবেন।
​কিশোর অপরাধীদের সংশোধন নিশ্চিত করা নিশ্চয়ই ইতিবাচক, কিন্তু অপরাধ যখন সাধারণ মানুষের জীবন ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে, তখন আইনের কঠোরতার কোনো বিকল্প থাকে না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপরাধী চক্র গড়ে তোলার বিরুদ্ধে ইতালির মতো কঠোর সাজার বিধান আমাদের দেশেও জরুরী।পরিবর্তিত সময়ের প্রেক্ষাপটে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবিলম্বে বাংলাদেশের কিশোর অপরাধ সংক্রান্ত আইনটি সংশোধন ও যুগোপযোগী করা এখন সময়ের দাবি। আইনের এই কঠোর সংস্কারই পারে আমাদের কিশোর সমাজকে সঠিক পথে ফেরাতে এবং সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা সুসংহত করতে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:

সর্বাধিক পঠিত