লিবিয়া থেকে সাগরপথে নৌকায় করে গ্রিস যাওয়ার পথে পথ হারিয়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে সুনামগঞ্জের ১২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় ৯ মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থানায় একটি এবং দিরাই থানায় আরেকটি মামলা হয়েছে। সোমবার রাতে নিহতদের স্বজনরা পৃথকভাবে এ দুইটি মামলা দায়ের করেন। মামলার বাদী হয়েছেন ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের সোহানুর রহমানের বাবা ছালিকুর রহমান এবং জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান। এর আগে গত শনিবার লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে গ্রিস যাওয়ার পথে সাগরে একটি নৌকা দুর্ঘটনায় ২২ জন অভিবাসীর মৃত্যু ঘটে। তাদের মধ্যে ১৮ জনই বাংলাদেশি এবং এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার ১২ জন। নিহতদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ৬ জন, দোয়ারাবাজার উপজেলার ১ জন এবং জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন বাসিন্দা রয়েছেন। নিহতরা হলো- দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫), রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েক মিয়া ও বাসুরি গ্রামের সোহাস। এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম, জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান এবং ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী। এ ঘটনায়, নিহতদের পরিবার ও এলাকায় শোকের মাতম চলছে। স্বজনরা মানবপাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। টিয়ারগাঁও গ্রামের নিহত শায়েক আহমেদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা আখলুছ মিয়া উঠানে পড়ে বিলাপ করছেন। তিনি বলেন, “আমার পোলারে আইন্যা দে। আমার পোলারে না খাওয়াইয়া মারছে। আমি দালাল আজিজুলের ফাঁসি চাই।” তিনি আরও জানান, ছেলেকে গ্রিসে পাঠাতে এলাকার ইছগাঁও গ্রামের দালাল আজিজুল ইসলামের কাছে দুই দফায় মোট ১২ লাখ টাকা দিয়েছেন। আজিজুল বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থান করছেন এবং তিনিই এলাকার যুবকদের লিবিয়া থেকে গ্রিসে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। দিরাই উপজেলার নিহত সাহান এহিয়ার বড় ভাই জাকারিয়া জানান, দালাল জসিমের সঙ্গে প্রত্যেকের ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে গত মাসে তারা বাড়ি থেকে রওনা দেন। প্রথমে ৬ লাখ টাকা অগ্রিম দেয়া হয় এবং বাকি ৬ লাখ টাকা গ্রিসে পৌঁছানোর পর দেয়ার কথা ছিল। তাদের প্রথমে ঢাকা থেকে বিমানে সৌদি আরব, পরে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নেয়া হয়। কয়েকদিন ধরে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে শনিবার বিকালে আত্মীয়ের মাধ্যমে মৃত্যুর খবর জানতে পারেন পরিবার। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানান, এখন পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এঘটনায় ৯ জন দালালের নাম উল্লেখ করে এবং আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম আপাতত প্রকাশ করা হচ্ছে না। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

